চার্লস অ্যাডামস্: অদ্ভুতুরে রম্য রচনার জনক

https://bd.toonsmag.com/2019/10/blog-post_24.html
![]() |
newyorker.com |
সুস্থ মন ও স্বাভাবিক মস্তিষ্কের অধিকারী যে কোনো মানুষের জন্যই ভুতুড়ে, মৃত্যু সম্বন্ধীয় বা রহস্যময় কোনো বিষয়ের সংশ্লিষ্টতা কোনোভাবেই, আর যাই হোক, হাস্যরসের বিষয় হতে পারে না। আর সেই ভুতুড়ে বিষয়ই যদি রম্য রচনার মূল বিষয় হয়ে থাকে, তাও আবার কার্টুন শো’এর- তাহলে রচয়িতার মানসিক স্থিতি সম্পর্কে প্রশ্ন জাগতে পারে বৈকি! অদ্ভুতুরে রম্য রচনার জনক, কিংবদন্তী কার্টুনিস্ট ‘চার্লস অ্যাডামস্’ এর বেলায়ও তেমনটিই ঘটেছিল। যারা তাকে কাছে থেকে জানত না, সেসকল মানুষের জন্য এটা বিশ্বাস করা খুব কঠিন ছিল যে তিনি সম্পূর্ণরূপে সুস্থ মস্তিষ্কের অধিকারী একজন মানুষ; শুধু তাই নয়, তিনি ছিলেন একজন সত্যিকারের মেধাবী শিল্পী।
চার্লস অ্যাডামস্ ‘অ্যাডামস্ ফ্যামিলি’ এর স্রষ্টা। শুরুতে নিউ ইয়র্কার এ কার্টুন হিসেবে প্রকাশিত হলেও, এটি পরবর্তীতে দু’টি দীর্ঘ সময়ব্যাপী প্রচারিত টেলিভিশন ধারাবাহিক, দু’টি অ্যানিমেটেড কার্টুন শো, হলিউড এর তিনটি চলচ্চিত্র এবং ব্রডওয়ে’র একটি গীতিনাট্য হিসেবে রূপান্তরিত হয়।
প্রাথমিক জীবন
চার্লস স্যামুয়েল অ্যাডামস্ এর জন্ম ১৯১২ সালের ৭ জানুয়ারি নিউ জার্সি’র ওয়েস্টফিল্ড এ। নিউ ইয়র্ক এর নিউ ইয়র্ক সিটি’তে ১৯৮৮ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর তিনি মৃত্যুবরণ করেন। অল্প বয়সেই তার এই স্বকীয়, অদ্ভুতুড়ে কার্টুন রচনার প্রতিভার পরিচয় পাওয়া যায়। তারা বাবা, হিউ অ্যাডামস, প্রাথমিকভাবে একজন স্থপতি ছিলেন এবং পরবর্তীতে একটি পিয়ানো কোম্পানি’র ম্যানেজার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ছোটবেলা থেকে বাবা-ই ছিলেন তারা আঁকাআঁকির অনুপ্রেরণা। তার মায়ের নাম গ্রেস এম. স্পিয়ার।
![]() |
underthebutton.com |
ছেলেবেলা থেকেই চার্লস বেশ দুরন্ত ছিলেন, আর তার শৈশবের দিনগুলি যথেষ্টই চমকপ্রদ ছিল। শৈশবে তার বসত এলাকা, ওয়েস্টফিল্ডের ডাডলি অ্যাভেন্যু-তে, একটি বাড়িতে বিনা অনুমতিতে প্রবেশ করতে গিয়ে তিনি ধরা পরেন। ঐ বাড়ির মূল ভবনের পিছনের দিকে অবস্থিত গ্যারাজের ২য় তলার দেওয়ালে চকে আঁকা একটি কঙ্কালের ছবি পাওয়া যায়; এবং বলাই বাহুল্য যে সেটিকে অ্যাডামস্ এর একটি শিল্পকর্ম বলেই ধরে নেওয়া হয়। তবে আরও চমকপ্রদ খবর এই যে, ঐ বাড়িটিই চার্লসের রচিত ‘অ্যাডামস্ ফ্যামিলি ম্যানসন’ এর মূল প্রেরণা ছিল বলে মনে করা হয়।
তিনি ওয়েস্টফিল্ড হাই স্কুলে পড়ালেখা করেন, সেখানে বন্ধুরা তাকে ‘চিল’ নামে ডাকত। তিনি এই স্কুলের সাহিত্যভিত্তিক ম্যাগাজিন ‘ওয়েদার্ভেন’ এর জন্য কার্টুন ছবি আঁকতেন, এবং নিশ্চিতভাবেই সে সকল ছবি ছিল মৃত্যু সম্বন্ধীয় কোনো না কোনো বিষয় যেমন: কফিন, সমাধি ফলক, কঙ্কাল ইত্যাদি নিয়ে আঁকা। স্কুলের পাঠ চুকিয়ে, ১৯২৯ থেকে ১৯৩২ সালের সময়কালে তিনি উচ্চ শিক্ষা গ্রহণের জন্য ‘কোলগেট ইউনিভার্সিটি’, ‘ইউনিভার্সিটি অফ পেনসিলভানিয়া’ ও সবশেষে নিউ ইয়র্ক সিটি’র ‘গ্র্যাণ্ড সেন্ট্রাল স্কুল অফ আর্ট’ এ ভর্তি হন; এই তিনটি প্রতিষ্ঠানের প্রতিটিতে তিন মাত্র এক বছর স্থায়ী ছিলেন। ইউনিভার্সিটি অফ পেনসিলভানিয়া’র ‘স্কুল অফ আর্টস্’ কে অ্যাডামসের নামে নামকরণ করা হয় এবং এর সম্মুখভাগে অ্যাডামসের নিজের আঁকা ‘অ্যাডামস্ ফ্যামিলি’র একটি ছবি সাজিয়ে রাখা হয়েছে।
প্রাথমিক কর্মজীবন
![]() |
charlesaddams.com |
পড়ালেখা শেষ করে তিনি ‘ম্যাকফেডেন পাবলিকেশন্স’ এ যোগদান করেন এবং প্রকাশনীটির পাল্প ঘরনার গোয়েন্দা ম্যাগাজিন ‘ট্রু ডিটেক্টিভ’ এর লেআউট বিভাগে যোগ দেন। ম্যাগাজিনটিতে প্রকাশিত বিভিন্ন মৃতদেহের ছবি থেকে রক্তের পরিমাণ কমিয়ে ছবিগুলোকে একটু কম বিভৎস করাই ছিল তার কাজ। এরপর ১৯৩৫ সাল থেকে তিনি নিউ ইয়র্কারে একজন ফ্রিল্যান্স কার্টুনিস্ট হিসেবে দীর্ঘদিন কাজ করেন। প্রত্রিকাটিতে তার প্রথম কাজ প্রকাশিত হওয়ার পর থেকে তিনি এখানে নিয়মিতভাবে তার কাজ পাঠাতে থাকে। জীবনের শেষ বছর পর্যন্ত তিনি দীর্ঘ ৫৩ বছর এই পত্রিকার সাথে কাজ করেন।
মৃত্যু বিষয়ক, তার রচিত এই ধরনের রম্য রচনা খুব সহজেই সকল বয়সের পাঠকদের মন জয় করতে সক্ষম হয় এবং এর ফলে পত্রিকাটির বিক্রিও বাড়তে থাকে। ফলস্বরূপ, অ্যাডামসের নিজের উপার্জনও বৃদ্ধি পায় এবং তিনি ‘সপ্তাহে ১৫ ডলার’ বেতনের, গোয়েন্দা ম্যাগাজিনের চাকরিটি ছাড়তে সমর্থ হন; কিন্তু তারপরেও তিনি নিউ ইয়র্কারে প্রথম ৫ বছর একজন ফ্রিল্যান্সার হিসেবেই কাজ করেন। পরবর্তীতে, পাহাড় বেয়ে নিচের দিকে নামতে থাকা একজন স্কি-য়ার কে কেন্দ্র করে তার আঁকা একটি ছবি পত্রিকাটিকে এতটাই মুগ্ধ করে যে, একজন পূর্ণ দিবস শিল্পী হিসেবে কাজ করার জন্য তাকে আমন্ত্রণ জানানো হয়।
![]() |
ebay.com |
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে তিনি নিউ ইয়র্ক শহরেই অবস্থান করতে সমর্থ হন, যেসময়ে তার সমসাময়িক বেশিরভাগ শিল্পীকেই কোনো না কোনোভাবে সরাসরি যুদ্ধে যোগদান করতে হয়। ‘সিগন্যাল কর্প ফটোগ্রাফি সেন্টার’ এ সেনাবাহিনীর জন্য তিনি প্রশিক্ষণ বিষয়ক অ্যানিমেটেড চলচ্চিত্র নির্মাণ করতেন বলেই তিনি শহরে অবস্থান করতে সমর্থ হন। সর্বপ্রথম ১৯৩৮ সালে তিনি ‘অ্যাডামস্ ফ্যামিলি’র চরিত্রগুলি তৈরি করতে শুরু করেন এবং সেসময়েই এটি প্রথমবারের মত নিউ ইয়র্কারে প্রকাশিত হয়; কিন্তু ১৯৬৪ সালে টেলিভিশনে ‘দ্য অ্যাডামস্ ফ্যামিলি’ ধারাবাহিকটি প্রচারিত হওয়ার আগ পর্যন্ত তিনি এই চরিত্রগুলিকে নিজ নিজ স্বকীয় বৈশিষ্ট্য সহ পূর্ণরূপে তুলে ধরেননি। এই সময়কালে তিনি নিউ ইয়র্কার, কোলিয়ার্স ও টিভি গাইড এ কাজ করতে থাকেন। শুধু মাত্র একটি ছবি ব্যবহার করে পাঠকদের আকৃষ্ট করার মত গল্প তৈরিতে তিনি বিশেষভাবে পারদর্শী ছিলেন।
অ্যাডামস্ ফ্যামিলি
‘অভিনন্দন! একটি শিশুর জন্ম হয়েছে!’
- জনৈক নার্স, অ্যাডামস্ ফ্যামিলি
এই একটি সংলাপই ‘অ্যাডামস্ ফ্যামিলি’র পুরো ভাববস্তু এক কথায় তুলে ধরার জন্য যথেষ্ট।
১৯৪২ সালে অ্যাডামস্ ‘বারবারা জঁ ডে’ কে বিয়ে করেন। তিনি অ্যাডামসের মডেল ছিলেন; আর তার অনুকরণেই ‘অ্যাডামস্ ফ্যামিলি’র প্রধান নারী চরিত্র ও পরিবারটি মা ‘মর্টিসিয়া অ্যাডামস্’ কে রচনা করা হয় এবং তাকে সব সময়ই একটি সুদীর্ঘ কালো পোশাকে দেখানো হয়ে থাকে। শুধুমাত্র প্রথম স্ত্রী-ই নন, অ্যাডামসের পরবর্তী দুই স্ত্রী- ‘বারবারা বার্ব’ (তিনি একজন আইনজীবি ছিলেন) ও ম্যারিলিন ম্যাথিউজ মিলার- ও দেখতে মর্টিসিয়া’র মতই ছিলেন। অ্যাডামসের জন্য মর্টিসিয়া ছিল একজন আদর্শ নারী।
![]() |
dailycartoonist.com |
এই অস্বাভাবিক পরিবারটির অন্যান্য সদস্যরা হল- স্বামী গোমেজ, লার্চ নামের পরিচারক, ফ্রাম্প দাদীমা, ফেস্টার কাকু এবং পিউজলি (নয় বছর বয়সী ও অত্যন্ত দুরন্ত) ও ওয়েনেজডে (ছয় বছর বয়সী ও তার এক পায়ে ছয়টি আঙ্গুল রয়েছে) নামের দু’টি বাচ্চ। এছাড়াও ছিল কাকাত ভাই ইট্ট (লম্বা চুলওয়ালা বেঁটেখাট একজন মানুষ) এবং থিং (শব্দ করে হেঁটে চলা শরীরবিহীন হাত)। এই শেষ দুইটি চরিত্রের কোনোটিকেই পত্রিকায় প্রকাশিত কার্টুনে কখনও দেখা যায়নি, ১৯৬৪ সালে টিভিতে প্রচারিত ধারাবাহিকটিতেই এদের প্রথমবারের মত দেখা যায়। এর আগে ১৯৫৬ সালে অ্যাডামস্, সিণ্ডিকেটের এর জন্য ‘আউট অফ দিস ওয়ার্ল্ড’ নামে একটি কার্টুন স্ট্রিপ তৈরি করেন, এটিই ছিল পাঠকদের কাছে ‘অ্যাডামস্ ফ্যামিলি’র প্রাথমিক উপস্থাপন।
পরিবারের সদস্যদের অদ্ভুতুড়ে চরিত্রের জন্য এই পরিবারটিকে যতই উদ্ভট মনে হোক না কেন, এই পরিবারের সদস্যদের মাঝে অত্যন্ত দৃঢ় বন্ধন লক্ষণীয়। মর্টিসিয়া ও গোমেজ, আদর্শ স্বামী-স্ত্রী’র মত একে অপরকে ভালবাসে ও একে অন্যের প্রতি বিশ্বস্ত এবং তারা দুইজনেই তাদের সন্তান ও পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের প্রতি অত্যন্ত যত্নবান। দুই ভাইবোন- পিউজলি ও ওয়েনেজডে- প্রায়ই এমনভাবে মারামারি ও ঝগড়াঝাটি করে যেন একে অপরকে মেরেই ফেলবে, কিন্তু আসলে কখনই তা করে না।
টেলিভিশনে প্রচারিত ধারাবাহিকটির প্রযোজক ছিলেন ডেভিড লেভি। এটি একটি সফল কাজ ছিল এবং খুব দ্রুত চরিত্রগুলি মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে ওঠে। এর ফলস্বরূপ, ১৯৯১ ও ১৯৯৪ সালে এই ধারাবাহিকটি নিয়ে দুইটি পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মিত হয়।
কিন্তু এখানে একটি উল্লেখযোগ্য বিষয় এই যে, নিউ ইয়র্কার এর তৎকালীন সম্পাদক ‘উইলিয়াম শন’, টেলিভিশন ধারাবাহিকটির নিম্নমানের নির্মাণ কাজে এতটাই অসন্তুষ্ট ছিলেন যে তিনি ঘোষণা করেন যে, অ্যাডামসের কাজ তিনি আর প্রকাশ করবেন না। সৌভাগ্যবশত পরবর্তী সম্পাদক ভিন্ন রুচির ছিলেন। তিনি উক্ত নিষেধাজ্ঞা তুলে নেন এবং অ্যাডামস্ তার জীবনের শেষ বছর ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত পত্রিকাটিতে নিজের কাজ প্রকাশ করে যান।
চার্লস অ্যাডামস্ এর ব্যতিক্রমী ব্যক্তিগত জীবন
![]() |
pinterest.com |
‘গাড়ী- বরাবরই তার পছন্দের বিষয় ছিল। কাজেই এটা তার বিদায় নেওয়ার জন্য একটি সুন্দর মাধ্যম ছিল।’
- ম্যারিলিন ম্যাথিউজ মিলার, নিউ ইয়র্ক টাইমস্
১৯৮৮ সালের সেপ্টেম্বর মাসের ২৯ তারিখে, চার্লস অ্যাডামস্ নিজের গাড়ীর ভিতরে হার্ট অ্যাটাকে মৃত্যুবরণ করেন। তার তৃতীয় স্ত্রী ম্যারিলিন, স্বামীর মৃত্যু সম্পর্কে উপরোক্ত মন্তব্যটি করেন। এই মন্তব্য থেকেই বুঝা যায় যে এই স্বামী-স্ত্রী কতটা অদ্ভুত প্রকৃতির ছিল, নিশ্চিতভাবেই অ্যাডামস্ নিজে এর বেশিরভাগ কৃতিত্বের দাবিদার। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে ম্যারিলিনের, গৃহপালিত পশুপাখির জন্য নির্মিত কবরস্থানে তাদের বিয়ের অনুষ্ঠান সম্পন্ন হয়। ১৯৬০ সালে নির্মিত ‘সাইকো’ নামের চলচ্চিত্রে পরিচালক আলফ্রেড হিচকক, ‘নরম্যান বেটস্’ নামক মানসিক বিকারগ্রস্থ প্রধান চরিত্রের বাসস্থান হিসেবে অ্যাডামসের বাড়ির মত একটি বাড়িকেই তুলে ধরেন। আরও একটি মজার বিষয় এই যে, অ্যাডামস্ তার ৬০ বছরেরও বেশি দীর্ঘ কর্মজীবনের সকল কাজে নিজের নাম সাক্ষর করেছেন ‘চ্যাস অ্যাডামস্’ হিসেবে।
‘ডিজাইনের কথা চিন্তা করেই এটা করেছি। ‘চার্লস’ লেখার চেয়ে এটা দেখতে বেশি ভাল লাগে।’
চার্লস যদিও মৃত্যু সম্পর্কীয় এসকল বিষয়ে বিশেষভাবে আগ্রহী ছিলেন, কিন্তু বাস্তবজীবনে ব্যক্তি হিসেবে তিনি ছিলে অত্যন্ত নম্র, বিনয়ী, শান্তিপ্রিয় ও হাসিখুশি মনের মানুষ; এমনকি উচ্চস্বরের হাসিই তার ব্যক্তিত্বের অনন্য পরিচায়ক ছিল। তার ব্যক্তিত্বের আরও একটি ব্যতিক্রমী বিষয় এই যে তিনি একজন ক্লস্ট্রোফোবিক ছিলেন, অর্থাৎ বদ্ধ স্থানে দম আটকে যাওয়ার ভয় পেতেন এবং সাপকে ভীষণ ভয় করতেন।
‘অ্যাডামস্ ফ্যামিলি’ রচনা’র মাধ্যমে চার্লস- ‘গথ’ বিষয়টিকে, সার্বজনীন প্রচলন শুরু হওয়ার অনেক আগেই, একটি ট্রেণ্ডে পরিণত করেন। ১৯৫৪ সালে তিনি ‘ইয়েল হিউমার অ্যাওয়ার্ড’ লাভ করেন।