টোকাই কিন্তু বোকাই

বিডি.টুনসম্যাগ.কম রফিকুন নবী [জন্ম :২৮ নভেম্বর, ১৯৪৩] ছবি ::লেখক ১৯৭৮ সালে সাপ্তাহিক বিচিত্রায় টোকাইর আত্মপ্রকাশ। ষাটের দশক থেকে রন...

বিডি.টুনসম্যাগ.কম

রফিকুন নবী [জন্ম :২৮ নভেম্বর, ১৯৪৩] ছবি ::লেখক


১৯৭৮ সালে সাপ্তাহিক বিচিত্রায় টোকাইর আত্মপ্রকাশ। ষাটের দশক থেকে রনবী এমন একটি কার্টুন চরিত্র তৈরির কথা চিন্তা করছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রের কার্টুনিস্ট সুলজের 'চার্লি ব্রাউন' তাকে টোকাই করার জন্য অনুপ্রাণিত করেছিল বলে রনবী জানান। এমন একটি চরিত্র তৈরি করবেন, যার মুখে তুলে দেবেন চটজলদি মন্তব্য, অপ্রিয় সত্য, অথবা তীব্র আর গতানুগতিকতার বাইরের কোনো আলাদা পর্যবেক্ষণ, যা মানুষ বলতে চায় কিন্তু বিভিন্ন কারণে বলতে পারে না, তা অকপটে বলবে টোকাই। 
ডাস্টবিনের পাশে দাঁড়িয়ে যে সরল বিশ্বাসে আর সরল কথনে বলে যান সমস্যা ও কখনও সখনও সমাধানের কথা। কাকের সঙ্গে যার চরম দোস্তি। কাক অনেক সময় ক্ষয়ে যাওয়া সমাজের গায়ে ছুরি মারে। যার ফলা এফোঁড়-ওফোঁড় করে সমাজের ধজাধারীদের। ময়লার ডাস্টবিনের পাশে দাঁড়িয়ে থাকার কথা থাকলেও এখানে শক্তপোক্ত কিছু মানুষের দেখা পাওয়া গেল। চাঁদনি পসর রাতে অথবা নিকষ কালো অন্ধকারে ল্যাম্প পোস্টের পাশে বসে থাকার কথা। থাকে ফুটপাতে, ফেলে রাখা কংক্রিটের পাইপের ভেতর, পার্কের বেঞ্চিতে, ভাঙা দেয়ালের পাশে, কাঠের গুঁড়িতে, ঠেলা গাড়ির ওপরে, ইটের ওপর মাথা পেতে। তার পাশে থাকে কুকুর, কাক। কথা বলে কাক, গরু, ছাগল, মশার সঙ্গে। কথা বলে মানুষের সঙ্গেও। বুদ্ধিদীপ্ত, বিচক্ষণতায় ভরা, আবার রসে সিক্ত। সেখানে সে কখনও মনের আনন্দে মার্বেল ঘুঁটি দিয়ে খেলে, নৌকা চালায়, বাঁশি বাজায়, বেহালা বাজায়, কখনও রাস্তার বুকে উবু হয়ে লিখতে শুরু করে, কখনও আনন্দে দেয় ছুট। কখনও একা বসে থাকে, আবার কখনও পাঁচিলের উপরে ওঠে পাশের দেয়ালের অপরদিকে উঁকি দিয়ে দেখার চেষ্টা করে, রাজকীয় বাড়ির দরজায় হাজির হয় কাঁধে বস্তা নিয়ে। 
পুলিশ অফিসার বাবা রশীদুন নবীর বদলির চাকরির সুবাদে রফিকুন নবীর বাল্য ও কৈশোরকাল কেটেছে দেশের বিভিন্ন এলাকায়। পঞ্চাশের দশকের মাঝামাঝি ঢাকায় স্থায়ী হন তারা। পুরান ঢাকাতেই কৈশোর ও যৌবনের অনেকটা সময় কাটে রফিকুন নবীর। ১৯৫০ সালের মাঝামাঝি স্কুলে ভর্তি হন তিনি। এই দশকের মাঝামাঝি স্কুল পড়ুয়া রফিকুন নবী হাতে পান যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক থেকে প্রকাশিত মাসিক রম্য-ম্যাগাজিন 'ম্যাড'। ম্যাগাজিনের কার্টুনগুলো তার নজর কাড়ে। একই সময়ে কিছু ভারতীয় পত্রিকার চিত্রাঙ্কন দেখেও মুগ্ধ হন তিনি। মাসিক ম্যাগাজিন আর পত্রিকা_ এই দুয়ের মাধ্যমেই কার্টুনের সঙ্গে প্রথম পরিচয় হয় তার। সেগুলো সম্পর্কে জানার আগ্রহটা বেড়ে চলল দিন দিন। শুরু হলো সেগুলো সংগ্রহ করা। দশম শ্রেণীর ছাত্র থাকা অবস্থায় জীবনের প্রথম কার্টুনটি আঁকেন তিনি। কার্টুনটি ছিল ভিক্ষুকদের নিয়ে। বিষয় দারিদ্র্য। লক্ষ্য ছিল ভিক্ষুকদের ব্যবহার করে বাংলাদেশে দারিদ্র্যের অবস্থানটা তুলে ধরা। জীবনের প্রথম আঁকা সে কার্টুনটি কোথাও প্রকাশিত না হলেও আগ্রহ কমেনি এতটুকু।
শিল্পী রফিকুন নবীর শিল্পীজীবনের উত্থান ও বিকাশকে কয়েকটি পর্বে ভাগ করা যায়। প্রথম পর্ব : ১৯৬৪ থেকে ১৯৭৩ সাল। দ্বিতীয় পর্ব ১৯৭৪-১৯৯৮ সাল। তৃতীয় পর্ব-১৯৯৯ থেকে ২০০৯ সাল। চতুর্থ পর্ব ২০১০-২০১৩ সাল। প্রথম পর্বে চারুকলায় শিক্ষা গ্রহণ ও নিয়মিত চিত্রবিদ্যাচর্চা। দ্বিতীয় পর্যায় বিকশিত হয়েছে গ্রিসে উচ্চতর শিক্ষা ও কাঠখোদাই চিত্রচর্চায়। এ ছাড়া জলরঙ, তেলরঙ মাধ্যমে গতানুগতিকতামুক্ত চিত্রচর্চা করে আলোচিত হয়েছেন। ১৯৯৮ সালে শিল্পাঙ্গন গ্যালারিতে তার একক চিত্রপ্রদর্শনীতে এই পর্বের চূড়ান্ত প্রকাশ ঘটেছে। তৃতীয় পর্বে তার ব্যঙ্গচিত্রের টোকাই চরিত্র শিল্পমূল্য অর্জন করে। জলরঙ ছাড়াও এ সময় অ্যাক্রিলিক রঙের প্রাধান্য দেখা যায়। 
চতুর্থ পর্বে শিল্পী মুক্ত। ডিন হিসেবে অবসর নিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ থেকে। এ সময় তিনি বড় বড় ক্যানভাসে এঁকেছেন। তৃতীয় পর্ব থেকে শুরু করা পরিবার সিরিজ এ সময় আরও বিকশিত হয়েছে। সাধারণ গ্রামীণ মজুর, কৃষক, মাঝি-মাল্লা_ এসব চরিত্র আরও নিবিড়ভাবে উঠে এসেছে শিল্পী রফিকুন নবীর চতুর্থ পর্বের চিত্রকর্মে। সত্তর বছর বয়সে তারুণ্য যেন ভর করেছে তার হাতে।
দেশ স্বাধীন হলে ১৯৭৩ সালে রফিকুন নবী গ্রিস সরকারের বৃত্তি পেয়ে এথেন্সে যান চারুকলায় উচ্চতর শিক্ষা নিতে। গ্রিক অধ্যাপক গ্রামতোপুলসের অধীনে কাঠখোদাই চিত্রের ওপর পড়াশোনা করেন। ১৯৭৪ সালে করা তার অসাধারণ ড্রয়িংগুলো নামকরার মতো। বিদেশি মডেলদের নুড ড্রয়িংগুলো, বাস্তবসম্মত, কিন্তু অঙ্কন আছে শিল্পীর স্বকীয় স্টাইল। ১৯৭৬ সালে শিল্পী রফিকুন নবী ফিরে আসেন পরিবর্তিত নতুন দেশে। জাতির পিতা নিহত হয়েছেন। বাংলাদেশ রাষ্ট্রও চলছে উল্টোপথে। প্রতিবাদ করতে হবে, বেছে নিলেন কার্টুন। সমাজ ও মানুষের নানা অসঙ্গতি তুলে ধরে কার্টুনে তা প্রকাশ করতে শুরু করলেন। সৃষ্টি হয় টোকাই। মনের যাতনা যা বলতে পারছিলেন না তা অকপটেই প্রকাশ করতে শুরু করলেন টোকাইর মুখ দিয়ে। যা পরে দেশের সাধারণ মানুষের মুখপত্র হয়ে ওঠে।
১৯৬০ সালের দিকে পাকিস্তানি সেনাপতি আইয়ুব খানের সামরিক শাসন চলছে। সামরিক শাসনবিরোধী মনোভাব দানা বাঁধছে ছাত্র-জনতার মধ্যে। আইয়ুববিরোধী প্রথম দ্রোহ বাষট্টির শিক্ষা আন্দোলন। ঠিক এমন এক সময় চারুকলায় ভর্তি হন। আন্দোলনের তোড়ে বাতিল হয় হামুদুর রহমান শিক্ষা কমিশন। ওই আন্দোলনে পোস্টার এঁকে ও লিখে যুক্ত প্রথম প্রগতিবাদী আন্দোলনে। এখান থেকেই ব্যঙ্গচিত্র ও ইলাস্ট্রেশন আঁকার দিকে তার ঝোঁক তৈরি হয়। ১৯৬২ থেকে ১৯৬৮ সালে জলরঙে আঁকা ছবিগুলো সেই সময়ের পরাবাস্তবতা আর অনুসন্ধিৎসু আঁকাআঁকির প্রমাণ পাওয়া যায়। ছবিগুলোর রঙ প্রয়োগে প্রকৃতিকে প্রত্যক্ষ করা যায়। যেখানে শৈশবের চাঁপাইনবাবগঞ্জের রূপ ফিরে আসে বারবার। বর্ণ প্রয়োগে ধূসর রঙের ছাপ যত্রতত্র। ভূচিত্র ছাড়িয়ে জন্মস্থানের সাঁওতালদের অবয়ব এঁকেছেন কখনও কখনও। এঁকেছেন প্রিয় খোয়াই নদীর পাড়ে বিশাল নৌকায় গরুর গাড়ি ওঠানো হচ্ছে পারাপারের জন্য। যা তার প্রথম জীবনের কাজ। বৃহতের দিকে হণ্ঠন। ১৯৮৭ সালে ব্যাংককে অনুষ্ঠিত ইউনিসেফ কর্তৃক আয়োজিত চাইল্ড সারভাইভাল অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট-বিষয়ক সেমিনার, ১৯৯৭ সালে তুরস্কের ইস্তাম্বুলে অনুষ্ঠিত ফোক আর্ট-সংক্রান্ত সেমিনার ও সংস্কৃতিবিষয়ক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ, ১৯৯৪ সালে ভারতে বাংলাদেশ কালচারাল ফেস্টিভ্যালে এবং ১৯৯৬ সালে মেক্সিকোয় অনুষ্ঠিত শিশুশ্রমবিরোধী আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালে অন্যতম বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পেয়েছেন ঐতিহ্যবাহী শিশু-কিশোর সংগঠন খেলাঘরের ভাইয়া প্রয়াত সাংবাদিক বজলুর রহমান স্মৃতি পদক। ২০১৩ সালে পেয়েছেন 'হামিদুর রাহমান পুরস্কার'। 
টোকাই কই? কোথাও নেই। 
আছে তো, সর্বত্র হাট-বাজার, ঘর, সমাজ পরিবেশ, প্রতিবেশ, রাষ্ট্র , পররাষ্ট্র কোন বিষয় নিয়ে কথা বলেনি টোকাই। শেষে টোকাই হলো মিষ্টির বিজ্ঞাপনের মডেল। সেখানেও সে সফল দেদার বিক্রি হলো মিষ্টি। টোকাই বাসে চড়ল, চড়ল বাসের ছাদে, ট্রেনে, লঞ্চে, বিমানের ককপিঠে। সফর করল জাপান, ফরাসিসহ নানা দেশে। 
আচ্ছা টোকাইর বয়স কত? ডিকশনারিতে তো বলা আছে, টোকাইদের বয়স সাধারণত ৮ থেকে ১৫ বছরের মধ্যে হয়। সেই ষাটের দশক পেরিয়ে এখনও কি টোকাইর বয়স সেই ১৫তেই আছে? নাকি এই টোকাই চিরটোকাই। 
চিন্তা করে পাবেন না শিল্পী নিজেও। 
কাজেই টোকাইর কোনো বয়স হয় না। হিমুদের যেমন কোনো বয়স থাকে না। কিন্তু সমস্যা তো একটা আছে। এই একবিশ্বের যুগে ইঁদুর যদি চাঁদে যেতে পারে, পারে মঙ্গলগ্রহে পা রাখতে। আমাদের টোকাই কী দোষ করল? তাকে একটু চাঁদে পাঠানো গেলে বেশ হতো। নানা অভিজ্ঞতার সংমিশ্রণে কিছু নীতিবাক্য শুনতে পারতাম। ইদানীং বিভিন্ন কোম্পানি চাঁদে যাওয়ার অফার দিচ্ছে শুনলাম। ও একটু ঘুরে আসুক ত্রি-ভুবন। জানা গেল সমস্যা একটাই, টোকাই প্রাপ্ত বয়স্ক নয়, কাজেই চাঁদে যেতে পারবে না। দৈনিক সমকাল থেকে।

এই বিভাগে আরো আছে

চিত্র শিল্পী 9116917141573437745

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

সঙ্গে থাকুন

জনপ্রিয়

সাম্প্রতিক

নেটয়ার্ক

  • আঁকা-আঁকি আহ্ববান

    আপনার আঁকা, মজার মজার লেখা, ছবি আঁকার কলা-কৌশল, শিল্পীর জীবনী, প্রবন্ধ, চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা অথবা প্রদর্শনীর সংবাদ টুনস ম্যাগে ছাপাতে চাইলে পাঠিয়ে দিন। আমাদের ইমেইল করুন- bangla@toonsmag.com এই ঠিকানায়।

    সহায়তা করুন

    item