মৃত্যুর মিছিল চলছেই: সড়ক, নৌ, রেলপথ—কোথাও নেই নিরাপত্তা
সম্পাদকীয় বিডি.টুনসম্যাগ.কম বাংলাদেশে প্রতিদিন খবরে পত্রিকার পাতা খুললেই বা টেলিভিশনের পর্দায় চোখ রাখলেই চোখে পড়ে কোনো না কোনো ভয়াবহ দ...
https://bd.toonsmag.com/2026/03/Editorial2626.html
সম্পাদকীয়
বিডি.টুনসম্যাগ.কমবাংলাদেশে প্রতিদিন খবরে পত্রিকার পাতা খুললেই বা টেলিভিশনের পর্দায় চোখ রাখলেই চোখে পড়ে কোনো না কোনো ভয়াবহ দুর্ঘটনার সংবাদ। সড়ক, নৌ, কিংবা রেলপথ—কোনো মাধ্যমই আজ নিরাপদ নয়। এই অনিরাপত্তা ক্রমাগত কেড়ে নিচ্ছে শত শত মানুষের জীবন, পঙ্গু করে দিচ্ছে অজস্র পরিবারকে। জনমনে এখন প্রশ্ন: এই মৃত্যুর মিছিল কবে থামবে?
সাম্প্রতিক এক রিপোর্টের তথ্য অনুযায়ী, শুধুমাত্র এই চলতি মাসের সাত দিনেই সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ২০৪ জন। এই সংখ্যাটি কেবল পরিসংখ্যান নয়, বরং এটি একটি গভীর সংকটের চিত্র। প্রতিটি মৃত্যুর পেছনে জড়িয়ে আছে প্রিয়জন হারানোর আর্তনাদ এবং ভেঙে যাওয়া পরিবার।
সড়কে অনিরাপত্তা ও ফুটপাত দখলের চিত্র
আমাদের দেশের সড়কগুলো যেন মরণফাঁদে পরিণত হয়েছে। সাধারণ পথচারীদের জন্য শহরে চলাচল করা চরম দুর্বিষহ। ফুটপাত যেন পথচারীদের হাঁটার জন্য নয়, দোকানপাটের জন্য তৈরি হয়েছে। হকার আর দোকানদারদের দখলে থাকা ফুটপাতের কারণে পথচারীরা বাধ্য হয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মূল রাস্তায় চলাচল করেন। অথচ প্রশাসনের কার্যকর কোনো পদক্ষেপ চোখে পড়ে না এই ফুটপাতগুলো দখলমুক্ত করার ব্যাপারে।
অদক্ষ চালক ও ফিটনেসবিহীন গাড়ি
দুর্ঘটনার একটি প্রধান কারণ অদক্ষ চালকদের হাতে গাড়ি তুলে দেওয়া। অভিযোগ রয়েছে, অনৈতিক পন্থায় বা ঘুষের বিনিময়ে ড্রাইভিং লাইসেন্স পেয়ে যান অযোগ্য চালকেরা। এর সাথে ট্রাফিক আইনের দুর্বলতা ও প্রয়োগের অভাব তো আছেই। সড়কগুলোতে ফিটনেস বিহীন গাড়ির অবাধ চলাচল আর একটি বড় সমস্যা। ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন এবং অপরিকল্পিতভাবে সড়কে গাড়ি চলাচলের লাইসেন্স প্রদান—এসবই সড়ক দুর্ঘটনার ঝুঁকি বহুলাংশে বৃদ্ধি করছে। প্রশাসন যেন এই সমস্যাগুলোর কোনো কার্যকর নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না।
দৌলতদিয়ার ট্র্যাজেডি
শুধুমাত্র সড়কই নয়, নৌপথও সমানভাবে অনিরাপদ। সর্বশেষ দৌলতদিয়ায় ফেরিতে উঠার আগে একটি বাস নদীতে পড়ে যাওয়ার ভয়াবহ দুর্ঘটনা আমরা প্রত্যক্ষ করেছি। এই দৃশ্য প্রতিটি নাগরিকের মনে গভীর ভয় এবং উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। কয়েকদিন আগে সদরঘাটে দুটি লঞ্চের সংঘর্ষে ভয়াবহ দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান ৫ জন। ত্রুটিপূর্ণ ব্যবস্থাপনা এই দুর্ঘটনার জন্য দায়ী।
দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতা ও তদন্ত কমিটির প্রথা
প্রতিটি বড় দুর্ঘটনার পর সাধারণত একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয় এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে সামান্য কিছু ক্ষতিপূরণ দেওয়ার মাধ্যমে দায়িত্ব শেষ করা হয়। কিন্তু দিনের পর দিন সড়ক ও নৌপথ দুর্ঘটনায় উল্লেখযোগ্য কোনো প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ নেওয়া হয় না। যুগের পর যুগ ধরে এই সমস্যাগুলো সমাধান না করেই ফেলে রাখা হয়েছে। ফলে দুর্ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েই চলেছে।
"সড়ক, নৌ এবং রেলপথে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সরকারের অপরিহার্য দায়িত্ব। এই মৃত্যুর মিছিল বন্ধ করতে হলে কেবল তদন্ত কমিটি বা ক্ষতিপূরণের মাধ্যমেই দায়িত্ব শেষ করলে চলবে না। প্রয়োজন কার্যকর ও টেকসই পদক্ষেপ। অদক্ষ চালকদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া, ট্রাফিক আইনের সঠিক প্রয়োগ নিশ্চিত করা, ফিটনেসবিহীন যানবাহন চলাচল বন্ধ করা, এবং ফুটপাত দখলমুক্ত করা—এসবের জন্য সরকারকে এখনই সক্রিয় হতে হবে। নতুবা আমাদের এই অসহায় মানুষের জীবন হারানো চলবেই, আর আমরা হব এই মৃত্যুর মিছিলের নীরব সাক্ষী।"

