ত্রিশ বছর ধরে বিশ্বে প্রায় চারকোটি শকুন উধাও হয়ে পড়েছিলো : ইনাম আল হক

ইনাম আল হক। যার আরেক নাম পাখি প্রেমিক। তিনি দেশের মানুষের নিকট অ্যাডভেঞ্চার এবং পাখিকে জনপ্রিয় করতে দীর্ঘদিন ধরে ভূমিকা রেখে আসছেন। ১...


ইনাম আল হক। যার আরেক নাম পাখি প্রেমিক। তিনি দেশের মানুষের নিকট অ্যাডভেঞ্চার এবং পাখিকে জনপ্রিয় করতে দীর্ঘদিন ধরে ভূমিকা রেখে আসছেন। ১৯৪৫ সালে কুষ্টিয়া জেলার হিজলবট গ্রামে তার জন্ম। ১৯৬৬ সালে ফরিদপুর রাজেন্দ্র কলেজ থেকে বিজ্ঞানে স্নাতক পাস করেন। এক যুগ পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় প্রশাসন ইনস্টিটিউট থেকে স্নাতকোত্তর উত্তীর্ণ হন। ১৯৮৪-৯৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রে কমিউনিকেশন-ইলেকট্রনিক্স ইঞ্জিনিয়ারিং-এ প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। ১৯৬৭ সালে পাট গবেষণা ইনস্টিটিউটে যোগ দেন। তার দুই বছর পরে পাকিস্তান বিমান বাহিনীর ক্যাডেট হিসেবে অ্যারোনিটিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে যোগ দেন। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময় তিনি যুদ্ধবন্দী হিসেবে পাকিস্তানে বন্দী ছিলেন। ১৯৭৩ সালে ভারত-পাকিস্তান বন্দী বিনিময় চুক্তির ফলে মুক্তি পান। ১৯৯৫ সালে উইং কমান্ডার হিসেবে অবসর নেন। পরবর্তীতে ব্র্র্যাক এবং জি কিউ ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডে কাজ করেছেন । ২০০৫ সালে সব ধরনের চাকুরি থেকে অবসর নেন।

সৌখিন জীবন:
পাখি পর্যবেক্ষণ, গবেষণা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতি আগ্রহ বাড়াতে ১৯৯৬ সালে বাংলাদেশ বার্ড ক্লাব প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৯৭ সালে অ্যান্টার্কটিকা অভিযানে অংশ নেন। নিজের বয়স হয়ে যাওয়ায় অ্যাভারেষ্ট জয় করা শরীরে কুলোবে না। তবে অন্যদের পথ দেখাতে ২০০৩ সালে প্রতিষ্ঠা করেন বাংলাদেশ মাউন্টেনিয়ারিং অ্যান্ড ট্রেকিং ক্লাব। এ ক্লাবের উদ্যোগে এম এ মুহিত, নিশাত মজুমদার এবং ওয়াসফিয়া নাজনীন অ্যাভারেষ্ট জয় করেছেন। ইনাম আল হক 'এনভায়োরেনমেন্ট অব ঢাকা' নামে একটি বই লিখেছেন। এছাড়া ২০০৪ সালে বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি থেকে 'বাংলাদেশ উদ্ভিদ ও প্রাণী জ্ঞানকোষ' সম্পাদনায় যুক্ত ছিলেন। বর্তমানে তার বসবাস বনানীর ডিওএইচএস এলাকায়।

টুনস ম্যাগ বাংলার পাঠকদের জন্য পাখি এবং অ্যাডভেঞ্চার নিয়ে কাজ করা এই মানুষটির সাক্ষাৎকার নিয়ে লিখেছেন- নাদিম মজিদ। সাক্ষাৎকার নেওয়ার সময় সাথে ছিলেন টুনস ম্যাগ বাংলার সম্পাদক রফিকুল ইসলাম সাগর।

নাদিম : দীর্ঘদিন ধরে আপনারা পাখি নিয়ে কাজ করছেন। বাংলাদেশ বার্ড ক্লাব গঠন করেছেন। এ ক্লাব গঠনের কারণ বলবেন?
ইনাম : আমরা ক্লাব গঠন করার আগেও পাখি নিয়ে কাজ করতাম। তবে তা ব্যক্তি উদ্যোগে এবং বিচ্ছিন্ন আকারে হতো। বড় কোনো কাজ করা সম্ভব হতো না। ১৯৯৬ সালে আমরা পাখি সংরক্ষণ, গবেষণা এবং নতুন প্রজন্মকে পাখির প্রতি আকৃষ্ট করতে বাংলাদেশ বার্ড ক্লাব প্রতিষ্ঠা করি। প্রথম সভাতে আমরা মাত্র ৬ জন উপস্থিত ছিলাম।

নাদিম : বার্ড ক্লাব বর্তমানে কি কি কাজ করে আসছে?
ইনাম : বার্ড ক্লাব প্রধানত ৪ ধরনের কাজ করে আসছে। জলচর পাখি গণনা, বার্ড রিঙ্গিং, মাসিক সভা এবং মুখপত্র হিসেবে 'বাংলার পাখি প্রকাশ'।

নাদিম : জলচর পাখি গণনা সম্পর্কে একটু বলুন।
ইনাম : শীতকালে আমাদের দেশে বিভিন্ন দেশ থেকে প্রচুর পাখি আসে। তখন আমরা বিভিন্ন স্পটে পাখি চিহ্নিত এবং গণনা করি। দেখা যায়, আমাদের দেশে প্রতিবছর নতুন নতুন পাখি আসছে। এ কাজ আমরা প্রতিবছর জানুয়ারি মাসে করে থাকি। পাখি চিনতে অনেক সময় লাগে। দশ বছর সময় দিয়ে আমি মোটামুটি দেশের এবং দেশে আসা পরিযায়ী পাখিগুলোকে চিনতে পারি।

নাদিম : বার্ড রিঙ্গিং কি?
ইনাম : ঢাকার সদরঘাটের কাক মিরপুর আসে কিনা, এটা কিভাবে জানা যাবে? এটা জানা যাবে, যদি কাকের পায়ে রিং পরানো হয়। তখন মিরপুরে কোন রিং পরা কাক দেখলে উত্তর পাওয়া যাবে। আমরা বাংলাদেশ বন বিভাগের অনুমতি নিয়ে প্রতি বছর এ কাজ করে থাকি এবং কাজের একটি রিপোর্ট তাদেরকেও প্রদান করে থাকি।

নাদিম : পাখি নিয়ে গবেষণা করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান এখন কোন পর্যায়ে?
ইনাম : আমরা বেসরকারী উদ্যোগে কিছু কাজ করার চেষ্টা করছি। অবাক করা বিষয় হল পশ্চিমের দেশগুলোর প্রত্যেক শহরে কমপক্ষে পাঁচ- সাতজন পিঁপড়া গবেষক পাওয়া যায়। তাদের শহরে মোট কয়জাতের কি কি পিঁপড়া আছে, সে তথ্যও আছে। অথচ আমাদের দেশে পাখির ক্ষেত্রেও উল্লেখ করার মতো গবেষণা নেই। আমরা সরকারকে বলে আসছি, যাতে বন্যপ্রাণি সংরক্ষণের জন্য বন বিভাগে আলাদা বিভাগ খোলা হয়। তাহলে তাদের দপ্তর চালানোর জন্য হলেও কিছু কাজ করবে।

নাদিম : আপনাদের দীর্ঘ গবেষণার কাজে সবচেয়ে বেশি সহযোগিতা কার কাছ থেকে পেয়ে আসছেন?
ইনাম : আমরা মিডিয়ার কাছ থেকে সবচেয়ে বেশি পজিটিভ ভূমিকা পেয়ে আসছি। সরকারের বন মন্ত্রণালয়ের আমলাদের নিয়ে আমরা চিন্তিত থাকি। তাদের কোনো একটি বিষয় বুঝিয়ে কাজ আদায় করা প্রায় সময় খুব কঠিন হয়ে পড়ে।

নাদিম : আপনাদের ক্লাবের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি কি মনে করেন?
ইনাম : দেশে ডাইক্লোফেনাক নিষিদ্ধ করা।

নাদিম : একটু বুঝিয়ে বলবেন?
ইনাম : ত্রিশ বছর ধরে বিশ্বে প্রায় ৪ কোটি শকুন উধাও হয়ে পড়েছিলো। বিজ্ঞানীরা কারণ খুঁজতে দীর্ঘদিন গবেষণা করেন। ত্রিশ বছর পরে দেখা যায়, শকুন নিঃশেষ হওয়ার বড় কারণ ডাইক্লোফেনাক ওষুধ। এ ওষুধ গরুর ক্ষুরারোগসহ বিভিন্ন রোগে ভালো উপকার করে। দামেও সস্তা। অথচ এ ওষুধ কোন গরুতে প্রয়োগ করলে গরুটি মারা যাওয়ার পরে সমস্যা দেখা দেয়। মৃত গরুকে যে শকুন খায়, সে শকুন-ই দ্রুত মৃত্যুমুখে পতিত হয়। এভাবে পৃথিবী থেকে ৪ কোটি শকুন মাত্র ত্রিশ বছরে নিঃশেষ হয়ে যায়। ২০০৩ সালে পশ্চিমা দেশগুলো এ ওষুধ নিষিদ্ধ করলেও বাংলাদেশে নিষিদ্ধ করা হয়নি তখন। আমরা ৭ বছর ধরে বিভিন্ন সেমিনার, বৈঠক করে ২০১০ সালে তা নিষিদ্ধ করতে সক্ষম হয়েছি। এটা আমাদের সবচেয়ে বড় অর্জন বলে মনে করি।

নাদিম : আমরা জানি, আপনি মানেই বাংলাদেশ বার্ড ক্লাব।  আপনি এখন এ প্রতিষ্ঠানের কোন পদে আছেন?
ইনাম : আমি এ ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা। প্রতিষ্ঠার সময় সংবিধান ছিলো না। পরবর্তীতে সংবিধান প্রণীত হয়। দুইবারের বেশি কেউ সভাপতি হতে পারবে না। সংবিধান তৈরির পরে দুই মেয়াদে সভাপতি ছিলাম। এখন সদস্যরা আমাকে সেক্রেটারি হসেবে রেখেছে।

নাদিম : আচ্ছা! আমাদের কেউ এ ক্লাবের সদস্য হতে চাইলে কি করতে হবে?
ইনাম : যে কোন আগ্রহী ব্যক্তি বছরে এক হাজার টাকা ফি দিয়ে সদস্য হতে পারবে। প্রতি মাসের প্রথম মঙ্গলবার আমাদের ক্লাবের সাধারন সভা হয়ে থাকে।

নাদিম : অ্যাডভেঞ্চার নিয়ে কাজ করছেন আপনি। আপনি নিজে প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে অ্যান্টার্কটিকা অভিযানে অংশ নিয়ে সফলভাবে সম্পন্ন করেছেন। আপনাদের বাংলাদেশ মাউন্টেনিয়ারিং অ্যান্ড ট্রেকিং ক্লাব থেকে তিনজন অ্যাভারেষ্ট জয় করেছে। এ সিজনে কি কেউ অভিযানে যাচ্ছে?
ইনাম : এ সিজনে আমরা অ্যাভারেষ্ট অভিযানে কাউকে পাঠাচ্ছি না।

নাদিম : আপনি কষ্ট করে আমাদের টুনস ম্যাগকে সময় দিয়ে দীর্ঘ সাক্ষাৎকার দিয়েছেন। আপনাকে ধন্যবাদ।
ইনাম : আপনাদেরকেও ধন্যবাদ।

এই বিভাগে আরো আছে

সাক্ষাৎকার 2914841883804789869

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

সঙ্গে থাকুন

জনপ্রিয়

সাম্প্রতিক

নেটয়ার্ক

  • আঁকা-আঁকি আহ্ববান

    আপনার আঁকা, মজার মজার লেখা, ছবি আঁকার কলা-কৌশল, শিল্পীর জীবনী, প্রবন্ধ, চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা অথবা প্রদর্শনীর সংবাদ টুনস ম্যাগে ছাপাতে চাইলে পাঠিয়ে দিন। আমাদের ইমেইল করুন- bangla@toonsmag.com এই ঠিকানায়।

    সহায়তা করুন

    item