ছাত্রাবস্থা থেকেই জলরং ও তেলরং ছিল তাঁর প্রিয় মাধ্যম। তবে আমেরিকায় পড়তে গিয়ে তিনি স্পেশালাইজেশন করেন প্রিন্ট মিডিয়ামে, অর্থাৎ গ্রাফিস্ক বা ছাপচিত্রে। আইওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় তিনি প্রিন্ট-মাধ্যমে শিক্ষক হিসেবে পান বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রিণ্ট-মেকার প্রফেসার মরিসিও লাসানস্কিকে। লাসানস্কি নিবিষ্টপ্রাণ ছাত্র রাজ্জাককে অত্যন্ত যত্ন করে কাজ শিখিয়েছেন। প্রিন্ট-মেকিংয়ে রাজ্জাকের দক্ষতা ছিল অসামান্য এবং সেখানের ছাত্র থাকা অবস্থাতেই তিনি উত্তর আমেরিকার একাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রদর্শনীতে অংশগ্রহনের সুযোগ পান। সেখানে পড়াকালীন টেম্পেরা টেকনিক ও ভাস্কর্যে শিক্ষা লাভ করেন যা পরবর্তীতে তাঁর কর্মজীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন।
শিল্পী জীবনে আবদুর রাজ্জাক বিভিন্ন মাধ্যমে কাজ করেছেন এবং প্রতিটি মাধ্যমেই প্রতিভার চূড়ান্ত স্বাক্ষর রেখেছেন। বিভিন্ন মাধ্যমে কাজ করা প্রসঙ্গে শিল্পী নিজেই বলেছেন, "একমাত্র এভাবেই শিল্পী পরিপূর্ণতা পান। ত্রিমাত্রিক ভাস্কর্য-শিল্পের অনুশীলন ছাড়া বস্তুর আকারগত পদ্ধতি বা ফর্ম-সম্পর্কে ধারণা পরিষ্কার হয় না। তেমনি পেইন্টিং করা ছাড়া রঙের প্রকৃতিও বোঝা শক্ত। অন্যদিকে ড্রয়িং বুঝতে সাহয্য করে রেখার সাবলীলতা। পেইন্টিংয়ের চুড়ান্ত সাফল্য অর্জন করতে হলেও ভাস্কর্যের ফর্মগুণ এবং ড্রয়িংয়ের রেখার গুণ প্রয়োজন।" এই বিশ্বাস থেকেই তিনি বহু মাধ্যমে কাজ করেছেন।
১৯৬৩ সালে ভাস্কর্য বিভাগের দায়িত্ব নেয়ার পর একে প্রতিষ্ঠিত করতে অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন। বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর ১৯৭২ সালে বিমানবাহিনীর সদর দফতরের জন্য নির্মাণ করেন 'শাহীন' নামের সাদা-কালো ভাস্কর্য। একই বছর তিনি গাজীপুরের চৌরাস্তার স্থাপিত বহুল প্রশংসিত 'জাগ্রত চৌরঙ্গী' ভাস্কর্যটি গড়ে তোলেন। শিক্ষকতা থেকে অবসর গ্রহণের পরও এঁকেছেন একের পর এক ছবি।
১৯৬২ সালের দিকে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের ভ্রাতুস্পুত্রী মুস্তারী বেগমের সাথে রাজ্জাক বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। দুই ছেলে ও এক মেয়েকে নিয়ে তিনি একটি সুখী পরিবারের গর্বিত সদস্য ছিলেন। কিন্তু ১৯৮৯ সালের মে মাসে এক দুর্ঘনায় তাঁর ছোট ছেলে প্রতিভাবান তরুণ শিল্পী আরিফ আহমেদ তনু মারা যান। এ ঘটনার পর শোকাহত রাজ্জাক বেশ কিছুদিন শিল্পকর্ম থেকে দূরে ছিলেন কিন্তু পরে উপলব্ধি করেছিলেন, এ রকম দুঃসময় থেকে উত্তরণের উপায়ও একমাত্র শিল্পচর্চা। শিল্পই তাঁকে দু'দণ্ড শান্তি দিতে পারে সব দুঃখ থেকে। তাই আবার তিনি ছবি আঁকায়, ভাস্কর্য নির্মাণে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। বাস্তু-পরিবেশের সীমাবদ্ধতা কখনোই তাঁর শিল্পতাড়নাকে স্তিমিত করতে পারে নি। অনবরত কাজ করার মধ্যেই যেন তিনি বেঁচে থাকার আনন্দ ও সার্থকতা খুঁজে পান।
শিল্পী আবদুর রাজ্জাক ২০০৫ সালের ২৩ অক্টোবর ৭৩ বছর বয়সে যশোহরে মৃত্যুবরণ করেন। তিনি সেখানে একটি কর্মশালা পরিচালনা করছিলেন।
জীবনে আবদুর রাজ্জাক অনেক ছবি এঁকেছেন। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য- 'সোয়ারীঘাট', 'নৌকা নির্মাণ', 'আত্মপ্রতিকৃতি', 'অভ্যন্তর', 'বাগান', 'জলাশয়', 'মুসা খানের মসজিদ' ইত্যাদি। ভাস্কর্যের মধ্যে উল্লেখযোগ্য- 'শাহীন', 'জাগ্রত চৌরঙ্গী' (জয়দেবপুর চৌরাস্তার সড়কদ্বীপে অবস্থিত), 'কম্পোজিশন', 'নারী মুখমন্ডল', 'খাড়া-গড়ন' ইত্যাদি।
সরকারি আর্ট ইনস্টিটিউটের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র থাকাকালীন রাজ্জাক আর্ট গ্রুপের প্রদর্শনীতে অংশ নেন। প্রিন্ট-মেকিংয়ে রাজ্জাকের দক্ষতার কারণে আইওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীন তিনি বিভিন্ন প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণ করেন। ১৯৬৭ সালে তিনি একক প্রদর্শনী নিয়ে ইরান ও তুরস্ক ভ্রমণ করেন। এছাড়া যৌথ প্রতিনিধিদলের সদস্য হিসেবে ভারত, চীন ও সোভিয়েত ইউনিয়নসহ অন্যান্য দেশের প্রদর্শনীতে অংশ নেন। দীর্ঘ ৪০ বছর ধরে আঁকা ঢাকা বিষয়ক ৮৫টি ছবি নিয়ে ১৯৯৫ সালের জানুয়ারি মাসে চারুকলা ইনস্টিটিউটে ভিন্নমাত্রার একটি একক চিত্র প্রদর্শনীর আয়োজন করেছিলেন।
সুদীর্ঘ শিল্পী জীবনে আবদুর রাজ্জাক ঢাকা আর্ট গ্রুপ, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমী, বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর, বাংলাদেশ ভাস্কর সমিতি, বাংলাদেশ চারুশিল্পী সংসদ প্রভৃতি শিল্পকলা সম্পৃক্ত বিভিন্ন সংগঠনে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি দেশ-বিদেশে অসংখ্য চিত্র প্রদর্শনীর নির্বাচক মন্ডলীরসদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ১৯৮৯ সালে শিল্পকর্মের সামগ্রিক স্বীকৃতি স্বরূপ জাতীয় পর্যায়ের শ্রেষ্ঠতম পুরস্কার একুশে পদকে ভূষিত হয়েছেন তিনি । একই বছর বাংলাদেশ চারুশিল্পী সংসদ সম্মান লাভ করেন।
সংক্ষিপ্ত জীবনী:
জন্ম:আবদুর রাজ্জাক ১৯৩২ সালে বৃহত্তর ফরিদপুর জেলার ভেদরগঞ্জ থানার দিগর মহিশখালি নামের এক প্রত্যন্ত গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।
বাবা-মা: তাঁর বাবার নাম সাদর আলী আমিন। তাঁর মায়ের নাম রিজিয়া বেগম। চার ভাই, দু'বোনের মধ্যে আব্দুর রাজ্জাক সবার ছোট।
পড়াশুনা: গ্রামের প্রাথমিক ও নিম্নমাধ্যমিক স্কুলেই আব্দুর রাজ্জাক পড়াশোনা শুরু করেন। এরপর তিনি ফরিদপুর হাই স্কুলে এসে ভর্তি হন । ১৯৪৭ সালে যখন ভারত-বিভাগ হয় তখন ফরিদপুর হাই স্কুল থেকে মাধ্যমিক পাশ করেন। ১৯৪৯ সালে ফরিদপুর রাজেন্দ্র কলেজ থেকে দ্বিতীয় বিভাগে উচ্চমাধ্যমিক পাশ করেন। এরপর তিনি ভর্তি হন আর্ট ইনস্টিটিটে। ১৯৫৪ সালে প্রথম শ্রেণীতে প্রথম হয়ে স্নাতক ডিগ্রি সম্পন্ন করেন।
স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করার পর কিছুদিন তিনি ঢাকার সরকারি গবেষণা সংস্থা ম্যালেরিয়া ইনস্টিটিউটে আর্টিস্ট ও মিউজিয়াম কিউরেটর হিসেবে কর্মরত ছিলেন। এরপর প্রতিযোগিতামূলক ফুলব্রাইট বৃত্তি নিয়ে ১৯৫৫ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আইওয়া স্টেট ইউনিভার্সিটিতে স্নাতকোত্তর পর্যায়ে পড়তে যান এবং ১৯৫৭ সালে মাস্টার অব ফাইন আর্টস ডিগ্রি (এমএফএ) লাভ করেন। এজন্য আবদুর রাজ্জাককে কোর্স ও ষ্টুডিও'র কাজের পাশাপাশি একটি থিসিসও লিখতে হয়েছে।
কর্মজীবন: স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করার পর কিছুদিন তিনি ঢাকার সরকারি গবেষণা সংস্থা ম্যালেরিয়া ইনস্টিটিউটে আর্টিস্ট ও মিউজিয়াম কিউরেটর হিসেবে কর্মরত ছিলেন। এরপর প্রতিযোগিতামূলক ফুলব্রাইট বৃত্তি নিয়ে ১৯৫৫ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আইওয়া স্টেট ইউনিভার্সিটিতে স্নাতকোত্তর পর্যায়ে পড়তে যান এবং ১৯৫৭ সালে মাস্টার অব ফাইন আর্টস ডিগ্রি (এমএফএ) লাভ করেন। এজন্য আবদুর রাজ্জাককে কোর্স ও ষ্টুডিও'র কাজের পাশাপাশি একটি থিসিসও লিখতে হয়েছে।
মূলত আবদুর রাজ্জাকই ছিলেন বাংলাদেশের প্রথম ছাত্র যিনি চারুকলায় মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেছিলেন। তাঁর আগে যেমন এদেশে কেউ চারুকলায় সর্বোচ্চ ডিগ্রি গ্রহণ করেননি, ঠিক তেমনি পরবর্তী বহু বছর পর্যন্ত কেউ এ ব্যাপারে উৎসাহিতও হননি। অবশ্য একথা ঠিক পাকিস্তান আমলে সে সুযোগ ছিল একেবারেই সীমিত। বাংলাদেশ হবার পর অনেকের সামনে প্রচুর সুযোগ আসে তখন শিল্পীরা অনেকেই স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের দিকে আগ্রহী হন। পরে অনেকে চারুকলায় পিএইচডি ডিগ্রিও নিয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্র থেকে পড়াশুনা শেষ করে আবদুর রাজ্জাক ১৯৫৮ সালে ঢাকার সরকারি আর্ট ইনস্টিটিউটে শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। ছাত্রদের আন্দোলনের মুখে 'গভর্ণমেন্ট ইনস্টিটিউট অব আর্টস' ইস্ট পাকিস্তান কলেজ অব আর্টস এন্ড ক্রাফটসে রূপান্তরিত হয় এবং তখন থেকে বিএফএ স্নাতক ডিগ্রির পাঠক্রম শুরু হয়। ইনস্টিটিউটের অধ্যক্ষ জয়নুল আবেদিন ১৯৬৩ সালে রাজ্জাককে ভাস্কর্য বিভাগের দায়িত্ব দেন। প্রিন্ট-মেকিং, পেইন্টিং ও ড্রয়িংয়ে তিনি পারদর্শী ছিলেন। কিন্তু নতুন এ দায়িত্ব পেয়ে অবাক হলেও তিনি একে চ্যালেঞ্জ হিসেবে গ্রহণ করেন এবং ভাস্কর্য বিভাগ গড়ে তোলেন। কাজটি খুব সহজ ছিল না। কিন্তু তিনি সাফল্যের অনুসরণীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন। তাঁর হাতেই গড়ে উঠেছে এদেশের আধুনিক ভাস্কর্য চর্চার একগুচ্ছ প্রতিভাবান তরুণ শিল্পী- আনোয়ার জাহান, সৈয়দ আবদুল্লাহ খালিদ, শামীম শিকদার, হামিদুজ্জামান খান, এনামুল হক এনাম প্রমুখ। স্বাধীনতার পর থেকে এই মাধ্যমটির বিকাশ ঘটে এবং এটি সাধারণ মানুষের কাছাকাছি আসে।
১৯৮৩ সালে তিনি কলেজ অব আর্টস এন্ড ক্রাফটসের অধ্যক্ষের দায়িত্ব নেন। তাঁর সময়েই এটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তর্ভূক্ত হয় এবং একটি ইনস্টিটিউটে রূপান্তরিত হয়। ১৯৮৫ সাল পর্যন্ত তিনি ইনস্টিটিউটের ভারপ্রাপ্ত পরিচালকের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯৩ সালে ৬০ বছর বয়সে বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন নিয়মে অবসর নিয়ে দু'বছরের জন্য পুনঃনিয়োগ গ্রহণ করেন। এরপর দুই বছর এবং পরে আরো এক বছর তিনি অধ্যাপনা করেন। আশির দশকের মাঝামাঝি পর্যন্ত তিনি বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপত্য অনুষদে খণ্ডকালীন শিক্ষক হিসেবে ড্রয়িং ও ডিজাইন শেখাতেন।
সংসার জীবন:১৯৬২ সালের দিকে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের ভ্রাতুস্পুত্রী মুস্তারী বেগমের সাথে রাজ্জাক বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। তাঁর দুই ছেলে ও এক মেয়ে। ১৯৮৯ সালের মে মাসে এক দুর্ঘনায় তাঁর ছোট ছেলে প্রতিভাবান তরুণ শিল্পী আরিফ আহমেদ তনু মারা যান। তাঁর বড় ছেলে একটি খ্যাতিমান ঔষধ প্রস্তুতকারক কোম্পানির পরিচালক হিসেবে কাজ করছেন। মেয়ে যুক্তরাষ্ট্রে থাকেন।
মৃত্যু: শিল্পী আবদুর রাজ্জাক ২০০৫ সালের ২৩ অক্টোবর ৭৩ বছর বয়সে যশোহরে মৃত্যুবরণ করেন। তিনি সেখানে একটি কর্মশালা পরিচালনা করছিলেন।
তথ্যসূত্র: 'আব্দুর রাজ্জাক' - নজরুল ইসলাম, সম্পাদনা-সুবীর চৌধুরী, প্রকাশক-পরিচালক/চারুকলা বিভাগ বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমী, জুন, ২০০৩; 'শিল্পীর চোখ'- বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর, তরফদার প্রকাশনী, ফেব্রুয়ারি, ২০০৭।
লেখক : গুণীজন দল
পুনর্লিখন: চন্দন সাহা রায়