বই আঁকতে দিছি এই তো বেশি, আবার টাকা!

বিডি.টুনসম্যাগ.কম স্কুলে পড়ার সময় মনে হলো প্রচ্ছদ আঁকবেন। বড় হয়ে ভর্তি হলেন চারুকলায়। বাংলাদেশের প্রচ্ছদশিল্পে ধ্রুব এষ এক অনন্য নাম। তবে ...

বিডি.টুনসম্যাগ.কম
স্কুলে পড়ার সময় মনে হলো প্রচ্ছদ আঁকবেন। বড় হয়ে ভর্তি হলেন চারুকলায়। বাংলাদেশের প্রচ্ছদশিল্পে ধ্রুব এষ এক অনন্য নাম। তবে তিনি বিশ্বাস করেন না, প্রচ্ছদের কারণে বইয়ের বিক্রি বাড়ে। ধ্রুব এষের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আহমেদ রিয়াজ ও চন্দন চৌধুরী


ধ্রুব এষ / ছবি সূত্র : ফেসবুক


প্রচ্ছদের জগতে কিভাবে এলেন? আপনার প্রথম প্রচ্ছদ কোনটি?

প্রথম প্রচ্ছদ করেছিলাম 'ছুটোছুটি' নামের একটি বইয়ের। মোস্তাক আহমদের ছড়ার বই। বাই কালারের কাভার। কিশোর জগৎ থেকে বের হয়েছিল। দুই কালারে একটা মেয়ের মুখ, একটা ছেলের মুখ আর একটা ফড়িং এঁকেছিলাম। তবে এই বইয়ের মধ্যে হাশেম স্যারের একটা ড্রইং ট্রেসিং করে রং করে দিয়েছিলাম। এটা কত সালের ঘটনা, মনে করতে পারছি না। পঁচাশিতে হবে না। তখন চারুকলায় ভর্তি হলাম। সেই যে মোস্তাক ভাইয়ের প্রচ্ছদ করেছিলাম, এবার এত বছর পরে আবার তাঁর আরেকটা প্রচ্ছদ করলাম। সে একটা উপজেলায় থাকে। কিভাবে শুরু করলাম- বারবারই বলি যে আমি আসলে প্রচ্ছদই করতে চেয়েছিলাম। চারুকলায় ভর্তিই হয়েছি শুধু প্রচ্ছদ আঁকব- এই চিন্তা করে।

এই যে প্রচ্ছদ করবেন ভেবেছেন, এটা কিভাবে মাথায় এলো?

নাইন-টেনে যখন পড়ি, তখনই মনে হয়েছে আমি প্রচ্ছদ আঁকব। কিন্তু কিভাবে মনে হয়েছে, কিভাবে মাথায় এলো বলতে পারব না। বই পড়তে গিয়ে বিভিন্ন কাভার-টাভার দেখেছি। নিজে নিজে পত্রপত্রিকা কেটে জোড়া দিয়ে প্রচ্ছদ বানাতাম। বাড়িতে বই ছিল। সেগুলোকে বাইন্ডিংটাইন্ডিং কইরা নিজে নিজে প্রচ্ছদ বানাইতাম।

সেবা প্রকাশনীর সঙ্গে যুক্ত হলেন কিভাবে?

ঢাকা এসেছি বাড়ি থেকে পালাইয়া। ১৯৮২ সালে। ম্যাট্রিক পরীক্ষা দেওয়ার পরে সরাসরি চইল্যা আসছি ঢাকায়। কিন্তু কাজী আনোয়ার হোসেনের লেখা নিয়ে এত অন্ধ ছিলাম, শুধু কাজী আনোয়ার হোসেনকে দেখার জন্য ঢাকা চইল্যা আসছি। রোজার মাসে কাজীদার সঙ্গে দেখাও করছি। তারও অনেক পরে সেবার সঙ্গে যোগাযোগ। ওই সময় ডাইজেস্টের থেকে একটা লেখা অনুবাদ করেছি। ওইটা দিতে আসছিলাম। লেখা দিতে আসার পর নিয়াজ মোর্শেদের সঙ্গে পরিচয় হলো। মূলত নিয়াজ ভাইয়ের মাধ্যমেই রহস্য পত্রিকায় লেখালেখির একটা যোগাযোগ গড়ে উঠেছে। তখন রহস্য পত্রিকার আর্টিস্ট ছিল আমাদের সিনিয়র ভাই, জেসি চৌধুরী। জেসি ভাই, মাস্টার্স করার জন্য বিশ্বভারতীতে চইল্যা গেল। ওই সময় নিয়াজ ভাই খবর দিল। আমি আসলাম। নিয়াজ ভাই বলল যে রহস্য পত্রিকায় কাজ করবা বা করতে পারবা? আমি ভাবলাম যে রহস্য পত্রিকায় কাজ করা তো সাংঘাতিক বিষয়। আমি এক বাক্যে রাজি। কিন্তু বলল যে এটা কিন্তু এক সংখ্যার জন্য। মানে জেসি ভাই যদি চলে আসে তবে ছেড়ে দিতে হবে। তো এক মাসই কাজ করলাম। এরপর জেসি ভাই ফিরে এলো। এরপর সবাই প্রতিক্রিয়া জানাল। সবাই ভালো বলেছিল। হাকিম ভাই বলেছিল রহস্য পত্রিকার চেহারাই বদলে গেছে। মহা খুশি হাকিম ভাই। সেদিন জেসি ভাইয়ের সঙ্গে আসলাম। ওই দিন আবার কাজীদার সঙ্গে পরিচয় হলো। আগে যে কাজীদাকে দেখতে এসেছি, ওইটা কাজীদার মনে থাকার কথা না। সেই '৮৭ সাল থেকে রহস্য পত্রিকায় কিন্তু আমি এখনো কাজ করি। সেবার বইয়ে আচ্ছন্ন ছিল আমাদের শৈশব। এই ব্যাপারে আমি কাজীদাকে একবার বলেছিলাম, আমাকে যদি তাড়াইয়া না দেন আমি রহস্য পত্রিকা ছাইড়া যামু না।

চারুকলায় যে ভর্তি হলেন, সেই গল্প বলুন।

চারুকলায় ভর্তি হলাম মানে, চারুকলায় পরীক্ষা দিলাম আর ভর্তি হলাম। আসলে সব মানুষেরই শৈশবে ফিরে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা থাকে। যারা চারুকলায় পড়েছে দ্বিতীয়বার শুধু ওই ক্যাম্পাসটার জন্য শৈশবটা ফিরে পায়। আমাদের ক্যাম্পাসটা এত অদ্ভুত। যদিও অনেক বছর আগে বের হয়ে এসেছি। এখনো তো শৈশবের মতোই মনে হয়। সময়টা শৈশবের সঙ্গে কানেকটেড হয়ে গেছে।

হুমায়ূন আহমেদের বই মানে আপনার প্রচ্ছদ, এমন একটা কথা চালু আছে। হুমায়ূন আহমেদের সঙ্গে প্রথম দেখা, পরিচয়- এসব সম্পর্কে জানতে চাই।

এটা কিন্তু অনেক পরে চন্দন। মানে, আমি আসলে এর আগে সবচেয়ে বেশি কাভার করছি মিলন ভাইয়ের। মিলন ভাইয়ের সঙ্গে যোগাযোগটা করাইল আমীরুল ভাই। আমীরুল ইসলামের সঙ্গে প্রথম লেখক হিসেবে পরিচয় হইছে। আমীরুল ভাইয়ের লেখা খুব পছন্দ করতাম। তাঁর বই কিনছিলাম। পরিচয় যখন হলো তখন সত্যজিৎ রায় প্রীতি নিয়া আমীরুল ভাইয়ের সঙ্গে একাত্মতা তৈরি হইল। তারপর ভালো প্রচ্ছদ কোনটা, কী- এগুলো নিয়ে আমীরুল ভাই অনেক কিছু বলেছে। সত্যজিৎ রায়ের এই প্রচ্ছদটা সুন্দর, সত্যজিৎ রায়ের ওই প্রচ্ছদটা সুন্দর। আমীরুল ভাই প্রথম এক প্রকাশককে নিয়া আসল। মোহনা প্রকাশনী। নিয়ে আসল মিলন ভাইয়ের একটা বইয়ের প্রচ্ছদ।

ইমদাদুল হক মিলনের সঙ্গেও তো অনেক স্মৃতি?

মিলন ভাইয়ের সঙ্গে প্রচ্ছদ নিয়া আমার মজার একটা বিষয় আছে। প্রথম প্রচ্ছদ হইল 'সুন্দরী কমলা' আর 'মহাযুদ্ধ'। দুইটা বইয়ের প্রচ্ছদ করলাম। মিলন ভাইকে নিয়া দেখাইল, পছন্দ হইল। এরপর আরো কয়টা প্রচ্ছদ করলাম। মোহনা, অনন্যা- অনেক প্রকাশনীর প্রচ্ছদ করলাম। তো ওই সময় মিলন ভাই আমাকে দেখা করতে বলেছে। আমি তো তখন ছেলেমানুষ। ছেলেমানুষী করে বললাম, না, যেদিন মিলন ভাইয়ের ২৫তম কাভার করব, সেদিন মিলন ভাইয়ের সঙ্গে দেখা করব। ২৫তম প্রচ্ছদটা করলাম 'ভূতের নাম রমাকান্ত কামার'। মিলন ভাই তখন কিশোর তারকালোকের সম্পাদক। ওই প্রচ্ছদ নিয়া দেখা করতে গেলাম। মিলন ভাইয়ের তো একটা ক্ষমতা সাংঘাতিক, নিমেষে আপন কইরা নেয়। এরপর ভয়ংকর একটা সারপ্রাইজ অপেক্ষমাণ ছিল। একদিন ঘুম থাইক্যা উঠছি, আমাদের হোস্টেলের রুমে, মানে হোস্টেলের রুম যেমন হয় আর কি। তিন-চারজন খাটে শুইয়া আছি। মশারির ভেতর থাইক্যা দেখি কী, মিলন ভাই আমার খাটে বইস্যা আছে। বলল, তোমারে দেখতে আসলাম। এটা অদ্ভুত স্মৃতি, এটা সাংঘাতিক বড় স্মৃতি।

হুমায়ূন আহমেদের সঙ্গে যোগাযোগ?

'৯১ না '৯২ সাল ঠিক মনে নাই। একজন প্রকাশক বলল, একজনের প্রচ্ছদ কি করবেন? বললাম, কার? কার বলার আগেই বলল যে এই লোক কিন্তু মহা খিটখিটা। প্রচ্ছদ পছন্দ না হইলে বারবার বদলাইতে হবে। বললাম, 'কার?' 'হুমায়ূন আহমেদের।' আমি হইলাম হুমায়ূন আহমেদের পাগল পাঠক। বললাম, অবশ্যই করব, করব না কিসের জন্য? সেটা হলো '১৯৭১।' করলাম। প্রথম দুইটা প্রচ্ছদ কইরা নিয়া গেল। দুই দিন পরে আইস্যা কইল যে পছন্দ হইছে না। আরো দুইটা করলাম। এই দুইটাও না। আরো দুইটা। এই দুইটাও না। তারপর মোহনার প্রকাশক বলল, আমাকে নাকি দেখা করতে বলছে। তারপর সেই নিয়া গেল। স্যার ওই সময় কোন বিভাগের ডিন না কী যেন!

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগে ছিলেন।

ওনার অফিসে গেলাম। যাওয়ার পর উনি কথাবার্তা বললেন। প্রথম দিন ভাই বলল, আচ্ছা ভাই, তোমার প্রচ্ছদ আমার পছন্দ হয় নাই, তুমি কি আরো প্রচ্ছদ করবা? আমি বললাম, হ্যাঁ, করব। বাইরে আইস্যা আমি প্রকাশককে কইলাম, প্রয়োজনে আমি ১০০টা প্রচ্ছদ করব, আমার প্রচ্ছদ পছন্দ করতে হবে। তারপরই একটা প্রচ্ছদ করেছি। কাভারের ওপর ১৯৭১ লেখা। এদিকে প্রকাশক আবার স্যারকে গিয়া বলেছে যে ১০০টা প্রচ্ছদ করব। এরপর যেই একটা প্রচ্ছদ করলাম, সেইটাই স্যারের পছন্দ হইয়া গেল। এরপর আর কাজ করি না। তখন স্যারের সব প্রচ্ছদই করেন সমরদা। সমর মজুমদার। দুই বছর পরে 'নুহাশ ও আলাদিনের আশ্চর্য প্রদীপ' করলাম। আবার প্রচ্ছদ নিয়া গেছে। ওই সময়ে স্যারের আরেকটা প্রচ্ছদ করলাম 'জনম জনম'। কাকলী থাইক্যা রিপ্রিন্ট হইল। 'দূরে কোথায়' ছিল মাওলার বই। আরেকটা হইল 'প্রিয়তমেসু'। এরপর কন্টিনিউয়াসলি স্যারের প্রচ্ছদ করতে থাকি। রিপ্রিন্ট মিলাইয়া স্যারের এত প্রচ্ছদ করছি। খুবই অবিশ্বাস্য, একটা লেখকের এতগুলো প্রচ্ছদ! দুই শরও বেশি। শ্রেষ্ঠ গল্প, শ্রেষ্ঠ উপন্যাস- এই ধরনের বিষয় তো আছে। আবার ধরো, বই দুই-তিনবার রিপ্রিন্ট হইছে, দুই-তিনবারই প্রচ্ছদ করেছি। এভাবে মিলাইয়া স্যারের আড়াই শ-তিন শ প্রচ্ছদ করেছি।

আপনাদের দুজনের ব্যক্তিগত সম্পর্কও খুব গাঢ় ছিল?

পরে তো প্রচ্ছদট্রচ্ছদ কি, আমি কি স্যারের কাছে প্রচ্ছদশিল্পী আর স্যার কি আমার কাছে লেখক! সেটা অনেক বড়, অনেক আলাদা বিষয়। যত দিন আমি প্রচ্ছদ করব, চিরকাল আমার মনে থাকবে। প্রত্যেকটা বইমেলায় ওনার অভাব আমি ফিল করব, যত দিন বাঁচব। প্রত্যেকটা শীতকাল। বইমেলা না, আসলে শীতকাল। যখন তিনি অসুস্থ, ক্যান্সার ধরা পড়ল। এর আগে আমি বই উৎসর্গ করেছি স্যারকে, আমার বই। স্যার অসুস্থ হওয়ার পর আমি স্যারকে উৎসর্গ করেছিলাম, এই একটা শীতকাল যায়, আশ্চর্য সন্ধ্যা আর একটাও যায় না। শীতকাল মানেই হইল আশ্চর্য কিছু সন্ধ্যার স্মৃতি স্যারের সঙ্গে। এই স্মৃতি ভোলা যাবে না।

বিশেষ কোনো স্মৃতি মনে পড়ছে?

স্যারের সঙ্গে সব স্মৃতিই বিশেষ। এখন তো প্রত্যেকটা মুহূর্ত বিশেষ, প্রত্যেকটা মুহূর্ত।

হুমায়ূন আহমেদের কোন বই প্রিয়?

স্যারের অনেক বই আমার প্রিয়। অনেক। একবার স্যারের লেখা ৪০ পৃষ্ঠার একটা প্রুফ দেওয়া হয়েছে আমাকে। বইয়ের নাম তখনো ঠিক হয়নি। গল্পটা কি- বউকে খুন কইরা ফালাইছে, খুন কইরা কী খাইছে-টাইছে, বাইরে গেছে। এরপর ফিরা আসছে বাড়িতে। খাটের ওপর বইসা আছে। বউয়ের নামটা সম্ভবত রূপা। তো, কথা বলতাছে, পিয়াস লাগছে, পানি খামু। ওইখানে না লেখাটা শেষ। আমার না একেবারে দম আটকাইয়া গেল। কী! এর পরে কী আসলে। কারণ এটা তো শেষ হলো না- লেখাটা এ রকম। এরপর ওই বইয়ের নাম দিয়া গেল। আমি আসলে সেই দম আটকানোর মধ্যেই থাকলাম। আমার তখন স্যারের সঙ্গে এই রকম ফ্রি অবস্থা ছিল না যে জিজ্ঞেস করব, কী হইল না হইল। ওই প্রচ্ছদটা করছিলাম মনে হয়, যখন 'গিয়েছে ডুবে পঞ্চমীর চাঁদ'। ওই বইটা বের হওয়ার পর আমি নিউ মার্কেটে হাঁটতে গিয়ে প্রথম দেখছি ফুটপাতে বইটা। দেইখ্যা সঙ্গে সঙ্গেই কিনছি। কিনে এন্যে দেখলাম যে এইটা সেই গল্প। আবার সেই প্রথম থাইক্যা পড়া শুরু করলাম। 'যখন গিয়েছে ডুবি পঞ্চমীর চাঁদ'- অসম্ভব প্রিয়, অসম্ভব প্রিয় একটি বই। অনেক বই-ই তো প্রিয়, এইগুলোর নাম বলব কী! মনে আছে কি সব কিছু! 'পিপলি বেগম' প্রিয় বই। সাংঘাতিক। যখন নামিবে আঁধার। একটা মানুষ ক্যান্সার আক্রান্ত। তখন কিভাবে এই লেখা সম্ভব! কিভাবে! অদ্ভুত।
আঁকা-আঁকিতে ব্যস্ত ধ্রুব এষ / ছবি সংগৃহীত।

প্রথম প্রচ্ছদ করে কত টাকা পেয়েছিলেন?

৫০ টাকা। মনে আছে, অনেক দিন ঘোরানোর পর টাকা দিছিল। একই সময়ে দেবাশীষ সরকার নামে একজনের ছড়ার বই অলংকরণ করেছিলাম। বইটার নাম সম্ভবত 'সাত-সতেরো'। যখন টাকা চাইতে গেলাম, বলল যে বই আঁকতে দিছি এই তো বেশি, আবার টাকা!

আপনার প্রচ্ছদে বইয়ের বিক্রি বাড়ে? এটা কি সত্য?

প্রচ্ছদের কারণে বইয়ের বিক্রি বাড়ে- আমার বিশ্বাস হয় না। কথাই তো আছে, বইয়ের মলাট, লেখকের ললাট। তাহলে এত রঙচঙা প্রচ্ছদের ভিড়ে রবীন্দ্রনাথের বই বিক্রি হয় কী করে? বিশ্বভারতীর বইগুলোর মতো প্লেন ও এত অসাধারণ প্রচ্ছদ কি আছে পৃথিবীতে? ধরো তুমি চারু মজুমদারের 'শেষ দিনগুলি' নামে একটা বই বের হইছিল ইন্ডিয়া থাইক্যা। এত কুৎসিত প্রচ্ছদ দেখিনি জীবনে, কিন্তু আমি তো বইটা কিনেছি। কারণ ওটা আমার পড়তেই হবে। তবে ব্যবসায়িক সত্যটা তো আমি বলতে পারব না। বারবারই আমার মনে হয় যে আমি বইয়ের ভেতরের মানুষ। তারাশঙ্করের বই আমি সাদা কাগজ দিয়ে দিলেও পড়ব। আমাকে যদি ফটোকপি করেও দেওয়া হয় আমি পড়ব।

আপনার কি মনে হয় বাংলাদেশের প্রচ্ছদশিল্পে একটা পরিবর্তন এসেছে আপনার হাত দিয়েই?

এইটা হইছে কি, ধরো আমি যে সময় কাজ শুরু করেছি, ওই সময় তো কম্পিউটার প্রযুক্তি নতুন ঘটনা। কাজেই এটা নিয়ে যত এক্সপেরিমেন্ট, যাবতীয় কিছু করার চেষ্টা করেছি! ওই সময় আমি এতটা সক্রিয় ছিলাম না। আর চেইঞ্জের কথা যদি বলি, আমার কাছে যেটা বারবার মনে হয়েছে, আমরা যখন প্রচ্ছদ করি ওই সময় হুমায়ূন আহমেদ একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। একেবারে প্রচ্ছদের রুচি নির্মাণ করে দিয়েছেন। ওনার প্রচ্ছদ এমন সব বিষয়ে করা হয়েছে, যেগুলো আগে চিন্তাও হয়নি।

কার প্রচ্ছদ ভালো লাগে?

বাংলাদেশে অনেকের প্রচ্ছদই ভালো লাগে। কাজী হাসান হাবিব, কাইয়ূম স্যার (কাইয়ূম চৌধুরী)। একেকজনের কাজ তো একেক রকম। নবী স্যারের (রফিকুন নবী) কাজ তো বাচ্চাদের জন্য অসাধারণ। হাশেম স্যারের (হাশেম খান) কাজ। আমি কিন্তু আফজাল ভাইয়ের (আফজাল হোসেন) অসম্ভব ভক্ত। উনি এই লাইনে ভালোভাবে সক্রিয়। আমার সবচেয়ে প্রিয় প্রচ্ছদশিল্পী যদি বলা হয় তবে আফজাল ভাই। কিশোর বাংলায় তাঁর কাজ দেখতাম। তাঁর কাজ দেখতে দেখতে বড় হওয়া আসলে। 'দীপু নাম্বার টু' কিশোর বাংলায় তখন ছাপা হলো ঈদ সংখ্যায়। আমি এখনো সবাইকে বলি, এসব অলংকরণ না দেখলে বোঝার উপায় নেই যে কী ছিল! অসম্ভব ভালো লাগত। তারপর কবিতার বইয়ের ক্ষেত্রে যদি বলো, সে খালিদ আহসান। শামসুর রাহমানের 'অবিরল জলভ্রমি' বইটার প্রচ্ছদটা জীবনে ভুলব না। এত সুন্দর প্রচ্ছদ। খালিদ ভাই হলো কবিতার বইয়ের জন্য অসাধারণ। তারপর ধরো মাহবুব কামরান। একেবারে অন্য টাইপের কাজ। এখন যারা কাজ করছে, তাদের মধ্যে সব্য (সব্যসাচী হাজরা)। বাচ্চাদের জন্য মামুনেরা (মামুন হুসাইন) ভালো কাজ করে। ভালো কাজ হলে যে কারো কাজই ভালো লাগে।

আপনার দিন কাটে কিভাবে?

ওই তো ঘুম থেকে উঠি, চা খাই। পত্রিকা পড়ি না, দেখি। তারপর তো কাজে চলে যাই। ৩টার পর তো বাসায় আসি। একটু বইপত্র পড়ি। সন্ধ্যার পর ছাদে আড্ডা দিই।

লেখালেখি শুরু হলো কিভাবে?

ছোট সময় লিখতাম, এরপর বাদ দিয়া দিছি। সিক্সে বা সেভেনে যখন পড়ি, ওই সময় ছড়া কবিতা যা হয়, সে সময় লিখেছি, তারপর বাদ। কী কারণে বাদ দিছি বলব না। কিন্তু কোনো দুঃখে না, ভয়ে, ভয়ে। তবে আমি খুব সম্ভবত পাঠক, পার্মানেন্টলি। ঢাকায় আসার পর পত্রপত্রিকায় কাজ করি, শুরুতেই আনোয়ার ভাইয়ের (কাজী আনোয়ার হোসেন) সঙ্গে খাটি। দৈনিক বাংলায় কিশোরদের পাতা প্রথম আমাদের দেশের রঙিন পাতা। আমীরুল ইসলাম ভাই সম্পাদক, এটার মধ্যে ছবি আঁকি। আমার না অঞ্জন দত্ত খুব প্রিয়। অঞ্জন দত্তের 'ভেংচি কেটে দ্যাখ' দেখছ না? একদিন দুপুরে একটা ভাঙা টেপ রেকর্ডার নিয়া শুনছি। এলিফ্যান্ট রোডে থাকতাম। অঞ্জন দত্তের সব গানই প্রিয়। তবে বেশি প্রিয় হলো 'ভেংচি কেটে দ্যাখ', আরেকটা হলো 'আলী বাবা'। এগুলো শুনে মনে হতো আমিই তো এটা। আমার মনে হলো, এগুলো তো আমি লিখতে পারি। একটা লেখা লিখলাম। কবিতা। আমীরুল ভাইকে খুবই সঙ্কোচিতভাবে দেখাইছি। আমীরুল ভাই বললেন, আরে মিয়া ছবি আঁইকা ফেলাও, ছাপি। আবার লেখা শুরু হলো। তারপর তো ধরো রহস্য পত্রিকার সঙ্গে জড়িত হলাম। রহস্য পত্রিকায় রিডার্স ডাইজেস্ট থেকে কিছু কিছু অনুবাদ করছিলাম। ওই সময় রহস্য পত্রিকায় কাভারের জন্য খুব ঝামেলা হতো। ভেতরের জিনিসের সঙ্গে কাভারের একটা সামঞ্জস্য থাকতে হবে, এই ধরনের একটা বিষয় ছিল। তখন তো নেটমেট কিচ্ছু নাই। ম্যাগাজিনের পাতা, টাইমের পাতা থেকে কোনো ভালো ছবি পাইলে ওইটার সঙ্গে মিলাইয়া ধরো রং কইরা প্রচ্ছদ বানাইয়া ফেলাই। আর সে গল্প নিয়ে একটা লেখা তৈরি করে ফেলি। এ জন্য অনেক লেখা হইত। গল্প লেখছি অনেক পরে।

আপনার বাচ্চাদের গল্প পড়তে বসলে একদম ধরে রাখে।

বাচ্চাদের গল্প হইল, আমাদের আশপাশে যেসব বাচ্চা আছে, এরা যা যা করে, এদের সঙ্গে আমার যেসব কথা হয়, এগুলোই আমি লিখি।

আপনি কি প্রচ্ছদের বাইরে পেইন্টিংও করেন?

না। আমি যা করি প্রচ্ছদ। পেইন্টিং আমি করব কেন? আমি কি পেইন্টিংয়ের স্টুডেন্ট! আমি স্টুডেন্ট প্রিন্ট মেকিংয়ের।

প্রিন্ট মেকিং তো করি না। পেইন্টিং বলতে আমি যা করি তা হইল ক্যানভাস কইরা যদি মনে হয় প্রচ্ছদ হইব তাইলে করি।

প্রচ্ছদের বাইরে আঁকাআঁকিতে আমার কোনো জগত নাই। প্রচ্ছদ রিলেটেড পুরোটা। মানে যা করি প্রচ্ছদের জন্যই করি। ছবি আঁকলেও মনে হয় নামটা বসাইয়া দিই। এইটাই তো প্রচ্ছদ।

অবসর সময়ে কী করেন?

ফিল্ম দেখি প্রচুর। এটাই তো বললাম না। বইমেলা নিয়ে এখন রুটিনের ব্রেক। কিন্তু ফিল্ম দেখি প্রচুর।

প্রিয় পরিচালক কে?

লুই বুনুয়েল। সাংঘাতিক প্রিয়। তারপর কিম কি দুক। সাংঘাতিক। সত্যজিৎ রায়, ঋতি্বক ঘটক, মৃণাল সেন। এঁরা তো অবশ্যই। কিন্তু বাংলা ছবিতে আমার স্পেশালই প্রিয় বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত। তাঁর ছবি ভেতরে একটা নাড়া দিয়ে যায়, কী একটা ঝাঁকুনি! রঙের ব্যবহার যে কী তা বোঝা যায়। তাঁর ছবিগুলো কবিতা। অসম্ভব কবিতা। কারণ উনিও তো অনেক বড় কবি। কাজেই ওই ছাপটা হয়তো থাকে ফিল্মে। সাংঘাতিক। চরাচর, উত্তরা- সবই। চরাচরে ওই যে ছেলেটা পাখিটা নিয়ে দৌড়ায়। পাখিটা পুঁতে যে পাখিটা গাছ হবে বাবা। তখন টনটন করে ভেতরটা। আলাদা।

কোন ধরনের বই পড়তে ভালো লাগে?

সব রকমের। বিশেষ করে ফিকশন।

প্রিয় লেখক?

সবচেয়ে প্রিয় লেখক তারাশঙ্কর। তারাশঙ্করের প্রত্যেকটা শব্দ আমি পড়তে চাই, তাই তারাশঙ্কর রচনাবলির বান্ডেল কিন্যা ফেলাইছি। পড়া শুরুও করছি। প্রত্যেকটা শব্দ পড়তাছি।

প্রিয় উপন্যাস?

এইটা কি একটা! মনে করো ছোটদের উপন্যাস আছে, বড়দের উপন্যাস আছে। অনেক প্রিয় উপন্যাস আছে। এইটা কি কোনো দিন একটা বলা যায়?

প্রিয় কবি?

জীবনানন্দ জীবনানন্দ জীবনানন্দ। আর যদি বলি প্রিয় বই কোনটি, তবে জীবনানন্দের কবিতাসমগ্র। কবিতার ক্ষেত্রে পৃথিবীতে যদি কোনো প্রিয় বই থাকে এটা জীবনানন্দের কবিতার বই। প্রত্যেক দিন আধা লাইন হইলেও চোখ বুলাই। তাই বলে মুখস্থ ধরলে আমি বলতে পারব না।

নিজের করা প্রিয় প্রচ্ছদ?

হুমায়ূন আহমেদের ছায়াবীথি, আবুল হাসানের কবিতাসমগ্র, ইরাবতীর মৃত্যু ও অন্যান্য। আর কোনটা? পিপলি বেগম প্রিয়। বিশেষ কারণে প্রিয়। এটা করতে গিয়েই আমার কাজের পুরো ধরনটা বদল করে ফেললাম। অনেক প্রচ্ছদই প্রিয়। তারপর ধরো গদ্যছড়া। এটাও খুব প্রিয় বই। আমাদের বাংলা টাইপ তো খুব বেশি সুন্দর নয়। ওই সময় ইংরেজি ফন্ট ব্যবহার করে দেখলাম বাংলা টাইপ বানানো যায় কি না। এটা নিয়া একটা স্পেশাল ফন্ট আছে। ওই টাইপ দিয়া আমি বাংলা টাইপের কাজ করছি। মানে গদ্যছড়া দিয়ে এই ধরনের কাজ শুরু। পরে এই টাইপ ইলাস্ট্রেটরে উল্টাপাল্টা কইরা পাখি, মেঘ, মানুষের মুখ- যখন যা দরকার হইছে বানাইছি।

অন্যের করা প্রিয় প্রচ্ছদ?

সত্যজিৎ রায়ের তো সব প্রচ্ছদই প্রিয়। সবচেয়ে প্রিয় প্রচ্ছদ হইল পূর্ণেন্দু পত্রীর করা সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের একা এবং কয়েকজন। আমি না এখনো কল্পনাও করতে পারি না, শুধু টাইপ দিয়া মানুষের ফিলিংস তুলে ধরা কতটুকু মেধা বা সৃষ্টিশীলতা থাকলে সম্ভব! এটা যারা বইয়ের সঙ্গে জড়িত তারা বুঝবে। এইটা হইল যে কী পরিমাণ আলাদা হইতে পারে। বিস্ময়কর। একা এবং কয়েকজন কয়েকজন কয়েকজন পর পর টাইপের মধ্যে কালার দেওয়া। দেখলে মনে হয়, একা এবং কয়েকজন দাঁড়াইয়া আছে। কিন্তু ফিগারের কোনো ঠিক নাই। কিন্তু এটাই কয়েকজনের ফিলিংস নিয়ে আসে। তারপর হলো পূর্ণেন্দু পত্রীর উলঙ্গ রাজা। জীবনেও ভুলব না। 'ব্যক্তিগত ও নৈর্ব্যক্তিক' আবু সায়ীদ আইয়ুবের। এটাও পূর্ণেন্দু পত্রীরই। এগুলো তো বিস্ময়কর সব কাজ। আর সত্যজিৎ রায়ের প্রচ্ছদ তো বলে শেষ করা যাবে না। লীলা মজুমদারের 'জোনাকি' উপন্যাসের প্রচ্ছদটি তো অসাধারণ।

আঁকা-আঁকির কাজটা করেন কোন সময়?

মেলা আসার আগে, বিশেষ করে নভেম্বর মাস থেকে কোন সময় আঁকি কোনো ঠিক নেই। কিন্তু সকালে আমি কাজ করতে পারি না। মূলত রাতে। আসলে ১২টা থেকে ৩টা পর্যন্ত। বলতে পারো প্রচ্ছদ করার জন্য যে আঁকাআঁাকির হোমওয়ার্কটা কোন সময় করি! আমি প্রচ্ছদ আঁকি না আসলে, প্রচ্ছদ বানাই।

(১ ফেব্রুয়ারি, পুরানা পল্টন, রাত পৌনে ৯টা থেকে পৌনে ১০টা)



দৈনিক কালের কন্ঠে প্রকাশিত 

এই বিভাগে আরো আছে

সাক্ষাৎকার 3486076146617956778

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

সঙ্গে থাকুন

জনপ্রিয়

সাম্প্রতিক

নেটয়ার্ক

  • আঁকা-আঁকি আহ্ববান

    আপনার আঁকা, মজার মজার লেখা, ছবি আঁকার কলা-কৌশল, শিল্পীর জীবনী, প্রবন্ধ, চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা অথবা প্রদর্শনীর সংবাদ টুনস ম্যাগে ছাপাতে চাইলে পাঠিয়ে দিন। আমাদের ইমেইল করুন- bangla@toonsmag.com এই ঠিকানায়।

    সহায়তা করুন

    item