ভোটের ধুম

বিশ্বজিৎ দাস বিডি.টুনসম্যাগ.কম এক. ‘দারুণ চিন্তায় আছি।’ সমীর বলল। ব্যাংকের ক্যাশ অফিসার। ‘কেন?’ বলল আজাদ, সদ্য ব্যাংকে ঢুকেছে ও। ...

বিশ্বজিৎ দাস
বিডি.টুনসম্যাগ.কম

এক.
‘দারুণ চিন্তায় আছি।’ সমীর বলল। ব্যাংকের ক্যাশ অফিসার।
‘কেন?’ বলল আজাদ, সদ্য ব্যাংকে ঢুকেছে ও।
‘সামনে ভোট। ভোট গ্রহণ করার দায়িত্ব কাঁধে চাপাতে পারে নির্বাচন কমিশন।’ চিন্তিত স্বরে বলল সমীর।
‘কেন? ভোট গ্রহণ কী খুব কষ্টকর?’ জানতে চাইল ও।
‘কষ্ট তো বটেই। কোন না কোন গ্রামের স্কুলে সেন্টার পড়বে। সেখানে আগের দিন ভোটের সরঞ্জাম নিয়ে যেতে হয়। নাওয়া-খাওয়া ঘুমানো কোনটারই ঠিক থাকে না। তাছাড়া ভোটকেন্দ্রে গ-গোলের ভয় তো আছেই।’
‘না নিলেই পারেন এই দায়িত্ব।’ কিছু না বুঝেই বলল আজাদ।
‘তাই কী হয়? কমিশন যাকে দায়িত্ব দেবে সে করতে বাধ্য। নয়তো চাকরিই চলে যাবে।’
‘তাই না কি?’
‘হুঁ! তবে আপনি তো বেঁচে গেছেন।’
‘কেন?’
‘আপনি নতুন ঢুকেছেন না চাকরিতে। আপনার নামই তো ব্যাংক কর্তৃপক্ষ পাঠায়নি কমিশনে। ভোটের দায়িত্ব পাবেন না আপনি।’

কয়েকদিন বেশ ফুরফুরে মেজাজে চাকরি করল আজাদ। ভোটের দায়িত্ব পাওয়া নিয়ে সিনিয়র কলিগদের দুঃশ্চিন্তা তাড়িয়ে তাড়িয়ে উপভোগ করল। কেউ জিজ্ঞেস করার আগে যেচে সবাইকে জানিয়ে দিল- এই ভোটে দায়িত্ব পাচ্ছি না আমি, কাজেই খুব ভাল আছি। কিন্তু কমিশন থেকে যখন দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রিজাইডিং অফিসারদের নামের লিস্ট এল তখন অবাক হয়ে আজাদ দেখল, তালিকায় ওর নামই রয়েছে। সমীরের নাম নেই!

দুই.
নয়টার মিটিং শুরু হতে দশটা বেজে গেল। ভোট বিষয়ক প্রশিক্ষণে বাঘা বাঘা সব অফিসাররা বক্তব্য দিলেন। আজাদ পেয়েছে পুরুষদের ভোট গ্রহণের দায়িত্ব। মিটিং এ পাশে বসে থাকা একজনকে জিজ্ঞেস করল ও,‘ভাই, আপনি কি পুরুষ?’
‘না। আমি মহিলা।’ নির্বিকারভাবে বলল লোকটি।
মিটিং শেষে একের পর এক প্রশ্নের বান ছুটতে লাগল প্রিজাইডিং অফিসারদের মুখ থেকে। একজন দাঁড়িয়ে জানতে চাইল, ‘স্যার ভোট কেন্দ্রে যদি গোলমাল হয় তাহলে আমি কয়জনকে গুলি করতে বলতে পারব?’
‘দুইজনকে। কারণ আপনি দুইজন অস্ব্রধারী  সাথে পাবেন।’
হাসির ফোয়ারা বয়ে গেল।
আরেক প্রশিক্ষণার্থী দাঁড়াল,‘স্যার ,ভোটকেন্দ্রে গোলমাল শুরু হলে আমি কি সেখানে থাকব না পালাব ?’
‘পরিস্থিতি সব বলে দেবে।’উত্তর এল।
আরেকজন উঠল, ‘স্যার, ভোটের আগের রাতে সহকারী প্রিজাইডিং আর পোলিং অফিসাররা কেন্দ্রে থাকতে চায় না। আমি কী করব?’
উত্তর এল, ‘সবাই একসাথে মিলেমিশে থাকবেন। রাতে তাদেরকে আপনার সাথে থাকতে বলবেন।’
‘কিন্তু স্যার, আমার সহকারীরা তো সব মহিলা।’
আবার হাসির হুল্লোড় উঠল।

তিন.
ভোটের আগের দিন কেন্দ্রে পৌঁছানোর পর কাজে লেগে পড়ল আজাদ। ওকে সহযোগিতা করল সহকারী প্রিজাইডিং অফিসার আর আনসারবাহিনী। সবার সহযোগিতা নিয়ে কেন্দ্রে ভোটিং বুথ সাজিয়ে ফেলল আজাদ।
‘স্যার, কাগজপত্রে লেখালেখির কাজ তো শেষ। এখন তাহলে আগামিকাল ব্যালটের পিছনে যে সিল মারতে হবে সেটা আজ রাতেই মেরে ফেলি।’
‘ভুলেও ও কাজ করবেন না।’ ধমক দিল আজাদ।
‘কেন স্যার?’
‘আমার মামা একবার এই কাজ করেছিলেন। কীভাবে কীভাবে যেন দৈনিক পেপারে ভোটের আগের রাতের সিল মারার ছবি প্রকাশিত হয়। ক্যাপশনে উল্লেখ করা হয় যে, পছন্দের প্রার্থীর পক্ষে সিল মারছে কমিশনের লোক। কমিশনও ভুল বুঝে মামাকে চাকরিচ্যুত করে তদন্ত কমিটি গঠন করে। সেই তদন্ত শেষ হতে পাঁচ বছর সময় লাগে। এই পাঁচ বছরই মামা বেকার ছিলেন।’

গল্প শুনে সবাই মুখ চাওয়াচাওয়ি করল। ব্যাপারটা যে এত সিরিয়াস কেউই বুঝতে পারেনি সেটা।
বাতি বন্ধ করে ঘুমিয়ে পড়ল আজাদ। একটু পরই ঘুম ভেঙ্গে গেল ওর।
পাশের ঘর থেকে চটাস চটাস শব্দ আসছে। চমকে উঠল ও। পাশের ঘরে থাকা আনসার বাহিনী ওকে লুকিয়ে ব্যালট পেপারে সিল মারছে না তো!

পাশের ঘরের দরজায় জোরে জোরে ধাক্কা মারল ও।
‘কে?’ ভীত একটা গলা শোনা গেল ।
‘আমি। কী করছ তোমরা?’
‘স্যার, মশা মারছি।’ 

 

চার.
মাঝরাতে কার যেন চিৎকারে যেন ঘুম ভেঙ্গে গেল।
‘কী হয়েছে?’ বাইরে পাহারায় দাঁড়ানো আনসার দু’জনকে জিজ্ঞেস করল আজাদ।
‘আগুন স্যার! কারা যেন পেট্রোল বোমা ছুঁড়ে মেরেছে।’
অনেক দূরে জ্বলতে থাকা আগুন দেখল ওরা।
ব্যাপার কী দেখার জন্য দু’জন আনসারকে ওখানে পাঠাল আজাদ।
তারা গেল তো গেলই। অনেকক্ষণ পরও যখন তারা ফিরল না তখন বাধ্য হয়ে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর মোবাইল টিমকে ফোন করল ও। মোবাইল টিম পৌঁছালে দুজন আনসার  নিয়ে আস্তে আস্তে জ্বলতে থাকা আগুনের দিকে এগিয়ে গেল আজাদ।

পেট্রোল বোমাটোমা কিছু নয়।
প্রচন্ড- শীত থেকে ঠান্ডার হাত থেকে বাঁচার জন্য কয়েকজন গরীব মানুষ আগুন জ্বালিয়েছে। প্রথমে দেখতে আসা আনসার দু’জনও নিশ্চিন্তে হাত দিয়ে আগুন পোহাচ্ছে আর গল্প করছে। ভুলেই গেছে তাদেরকে কী কাজে পাঠানো হয়েছিল!

পাঁচ.
টেনশনে রাতে ঘুম ভাল হয়নি আজাদের। কিন্তু ভোট ঠিক সময়েই শুরু করতে পারল ও। যদি অসম্পূর্ণ থেকেছে অনেক কাজ।
সকাল সকাল গোসল করার অভ্যাস ওর। সেটা হল না।
বাথরুমে বসে বসে আকাশ কুসুম কত কিছু রচনা করে ও প্রতিদিন- সেটাও হল না।
রোজকার মত নতুন বউয়ের হাতে রান্না করা নাস্তা খেতে পারল না।
সকালবেলার টিভি নিউজ দেখতে পারল না।
বরং নিজেই টিভি সাংবাদিকদের সামনে হাসিমুখে অনেক প্রশ্নের জবাব দিল। তাদের প্রশ্নগুলো মজাদার। যেমন-

আপনার এখানে কী মানুষ স্বতঃর্স্ফুভাবে ভোট দিতে পারছে?
একই ভোটার দুইবার ভোট দিচ্ছে না তো?
কোন গোলমালের আশংকা করছেন কী?
কয়টা নাগাদ ভোটের রেজাল্ট দিতে পারবেন?
আপনি নিজে কী ভোট দিতে পেরেছেন?
একজন সাংবাদিক ভোটারদের সাক্ষাৎকার নিল,‘আপনি কী জীবনে প্রথম ভোট দিলেন?’

‘ছার ,আমি ভোটার না । আনছার।’ ফিক করে হাসি উপহার দিল উত্তরদাতা।

ছয়.
হঠাৎ ফোনটা বেঁজে উঠল। বন্ধু কায়েসর ফোন।
‘দোস্ত, তুই পাগলাপুর কেন্দ্রে ভোট নিচ্ছিস?’
‘হ্যাঁ, কেন?’ উত্তর দিল আজাদ।
‘আমি আসছি। আমার একটু দরকার আছে।’ বলেই লাইন কেটে দিল ও।
ঘন্টাখানেক পরে কায়েস আসল। ‘দোস্ত, দ্যাখতো এই ৪২০ নম্বর ভোটার মেয়েটা ভোট দিয়েছে কী না?’
‘কেন?’
‘আরে, এই মেয়ের সাথেই আমার বিয়ের কথা চলছে। ঘটক বলল যে, মেয়ে আজ এই কেন্দ্রে ভোট দিতে আসবে। তাই মেয়ে দেখতে এসেছি।’
ভাগ্যিস মেয়েটি তখনও ভোট দিতে আসেনি। নয়ত বিয়েটাই ভেঙ্গে যেতে পারত।
কারণ, মেয়ে দেখে কায়েস খুব খুশি। কনে পছন্দ হয়েছে ওর। ভালই তো ভাবল আজাদ।
সবার মনেই দেখি লেগেছে।
ভোট দেয়ার ধুম!
ভোট বর্জনের ধুম!
বিয়ে করার ধুম!
একেবারে ধুম থ্রি!

সাত.
রাত নয়টার মধ্যে ফ্রি হয়ে গেল আজাদ। সহকারী রিটার্নিং অফিসারের কাছে ভোটের ফলাফল জমা দিয়ে সোজা চলে এল প্রিয়ার কাছে। গরম গরম ভাত আর আলু ভর্তা দিয়ে চেটেপুটে ভরপেট খেল ও। তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলে প্রিয়াকে বলল, ‘আর কোন টেনশন নেই। এবার নাক ডেকে ঘুমাব।’

বিছানায় গা এলিয়ে দিতেই দু’চোখ জুড়ে রাজ্যের ঘুম নেমে এল ওর। মোবাইলের বিশ্রি রিংটোন ঘুম ভাঙ্গিয়ে দিল আজাদের।
‘হ্যালো!’ ঘুম জড়ানো কণ্ঠে একরাশ বিরক্তি নিয়ে বলল ও।
‘স্যার, আপনি কোথায়?’
‘আমি, আমি তো বাসায়।’
‘স্যার, আপনি বাসায় কেন?’
‘মানে?’ খেঁপে উঠল আজাদ টেলিফোনকারীর উপর।
‘স্যার, আমরা আনসাররা বাড়িতে যেতে পারছি না।’
‘কেন?’
‘বারে! আপনি রিলিজ স্লিপে সই না করলে আমরা তো যেতেই পারবো না। প্লিজ স্যার একবার এখানে আসুন।’
ভোটের ফলাফল জমা দেয়া নিয়ে আজাদ এতই টেনশনে ছিল যে, ওর অধীনে থাকা আনসারদের রিলিজ স্লিপে সই না করেই বাসায় চলে এসেছে!
অগত্যা প্রিয়ার মুখ টিপুনি হাসি উপেক্ষা করেই ঠা-ার মধ্যে ঘর থেকে বেরিয়ে পড়ল ও।
ভোটের ফলাফল কেন্দ্রে ওর অপেক্ষায় থাকা পুলিশ আর আনসারদের রিলিজ স্লিপে সই করে ঘণ্টাখানেকের মধ্যে বাসায় ফিরে এল।
মাঝরাতে আবার ঘুম ভেঙ্গে গেল আজাদের।
দরজায় জোরে জোরে করাঘাত।
‘কে ?’ভীত হয়ে জানতে টাইল ও।
‘স্যার আমি থানা থেকে আসছি ।’
‘থানা থেকে ! কেন?’
‘স্যার মনে হয় আমাকে চিনতে পারেননি। আমি স্যার আপনার সাথে  ভোটের দায়িত্বে ছিলাম।’
‘কিন্তু এত রাতে বাসায় কেন?’
‘স্যার আপনি যে রিলিজ স্লিপ দিয়েছিলেন সেইটা স্যার থানায় জমা নিচ্ছে না।’
‘কেন? কোন ভুল হয়েছে?’
‘ভুল স্যার আপনার না, আমারই। ভোটের রেজাল্ট সিট ছাড়া রিলিজ স্লিপ জমা নিচ্ছে না থানায়। আমাকে একটা রেজাল্ট সিট তাড়াতাড়ি দ্যান স্যার।’   

 
বিশ্বজিৎ দাস
সহকারী অধ্যাপক
পদার্থবিজ্ঞান
দিনাজপুর সরকারি কলেজ, দিনাজপুর।


তারিখ : ০৪/১২/২০১৪

এই বিভাগে আরো আছে

রম্য গল্প 4738934148708993654

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

সঙ্গে থাকুন

জনপ্রিয়

সাম্প্রতিক

নেটয়ার্ক

  • আঁকা-আঁকি আহ্ববান

    আপনার আঁকা, মজার মজার লেখা, ছবি আঁকার কলা-কৌশল, শিল্পীর জীবনী, প্রবন্ধ, চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা অথবা প্রদর্শনীর সংবাদ টুনস ম্যাগে ছাপাতে চাইলে পাঠিয়ে দিন। আমাদের ইমেইল করুন- bangla@toonsmag.com এই ঠিকানায়।

    সহায়তা করুন

    item