বয়স

জোবায়ের রাজু ,বিডি.টুনসম্যাগ.কম :   অরণী এবার সেকেন্ড ইয়ারে পড়ে। ভালো ছাত্রী হিসেবে ক্যাম্পাসে তার জুড়ি নেই। দেখতেও মোটামুটি সুন্দরী বলা ...

জোবায়ের রাজু ,বিডি.টুনসম্যাগ.কম : অরণী এবার সেকেন্ড ইয়ারে পড়ে। ভালো ছাত্রী হিসেবে ক্যাম্পাসে তার জুড়ি নেই। দেখতেও মোটামুটি সুন্দরী বলা চলে। ভালো লালণের গান করতে পারে। আবৃত্তিতেও বেশ কয়েকবার পুরষ্কার জিতেছে। যেদিন আবৃত্তি শাখায় রাষ্ট্রীয় পুরষ্কার নিয়ে ঘরে এসেছে অরণী, সেদিন বাবা বললেন, আমার মেয়ে প্রতিভাবান।

উঠতি বয়সি এই মেয়ে অরণী যেদিন তাদের খেয়া পাড়ায় বাবার বয়সি সাবের খানকে দেখে, সেদিনই তার ভিতরে প্রেম বিষয়ক ব্যাপারটি একটু নড়েচড়ে উঠে। অথচ কি আশ্চার্য, এই মেয়ে সব সময় প্রেম ভালোবাসা জাতীয় ব্যাপার গুলি থেকে নিজেকে দূরে রেখেছে। কলেজে ভর্তি হবার পর থেকে ইমন নামের যে ছেলেটি প্রায়ই তাকে চিঠি পাঠাতো, তখনও সে ইমনকে পাত্তা না দিয়ে নিরব ভুমিকা পালন করেছে। তাছাড়া তাদের এলাকার চৌধুরী কন্যা অলকা যেদিন পাশের গ্রামের ইসহাক নামের ছেলেটির সাথে পালিয়ে গেল, তার পরের দিন চৌধুরী সাহেব গলায় দড়ি দেন। এই ঘটনার পর অরণী তার বাবাকেই নিয়ে ভেবেছে কেবল। তার বাবারও যেন এই পরিণতি না হয়।

কিন্তু এখন ঘটনা উল্টো। সাবের খানকে দেখার পর এমন লাগছে কেন! লোকটি মাঝ বয়সি। চোখে কালো মোটা ফ্রেমের চশমা। ঠোঁটের উপরে কালো গোঁফগুলি তাকে বেশ মানিয়েছে। পুরণো ছবির নায়কদের মত লাগে। হয়ত এই কারণে সাবের খানকে অরণীর এত ভালো লাগে। ভালো লাগতেই পারে। কিন্তু বিশেষ এক কারণে হয়তো সাবের খানকে অরণীর আরো অনেক ভালো লাগে! কি সেই বিশেষ কারণ? প্রেম? নাকি সাবের খানকে খুব কাছে পাবার এক গোপন ব্যাকুলতা? ধ্যাৎ, কি সব ভাবছে অরণী! প্রেম হতে যাবে কেন? আপন মনে হেসে উঠে অরণী।

তবুও সেটা প্রেম। অরণীর নিজেরও সেটা মনে হয়। কিন্তু মধ্য বয়সি একজন সাবের খানের প্রেমে এভাবে পড়ে যাবার কি এমন অর্থ আছে! অরণী নিজেও সেই অর্থ জানে না। শুধু জানে সাবের খানকে তার অনেক ভালো লাগে। বয়স না হয় সেখানে গৌণ! কিন্তু সাবের খানের কি ঘর সংসার আছে? থাকবে না কেন! এই বয়সি একজন লোকের সংসার থাকবে না, এটা কেমন কথা?

ততদিনে সাবের খানের সাথে অরণীর ভালো একটা সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। সম্পর্ক গাঢ় হবার একটা ছোট্ট গল্পও আছে। তিন মাস আগে পাড়ার কি একটা জলসায় অরণী তার সুরেলা গলায় দর্শকদেরকে মাতিয়ে রাখে। সেই জলসার দর্শক সারিতে ছিলেন সাবের খান। মুগ্ধ হয়ে তিনিও অন্য সবার মত অরণীর গান শুনছেন। অনুষ্ঠান শেষে নিজে গিয়ে অরণীর সাথে পরিচয় করেছেন, যা অরণী মোটেও প্রত্যাশা করেনি। সাবের খানের মত এত স্মার্ট এই লোকটা অরণীর গানের কীর্তণ গাওয়াতে অরণীতো অবাক।

তারপর প্রায়ই সাবের খানের সাথে অরণীর হঠাৎ হঠাৎ পথে ঘাটে দেখা হয়ে যেত। অরণী রক্ষ্য করত, সাবের খান কেমন যেন মুগ্ধ দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে থাকে। অরণীর চোখে চোখ পড়ে গেলে তিনি দ্রুত দৃষ্টি সরিয়ে নেন। তবে সাবের খানও কি তরুণী অরণীর মত তাকে নিয়ে ভাবছে? এটা ভাবলে অরণীর বুকের অতলে কেমন যেন একটা ঢেউ উঠে, আবেগের ঢেউ।

: অরণী, আমি তোমায় শ্রেয়সী নামে ডাকব।
: শ্রেয়সী! বাহঃ সুন্দর নাম তো!
: শ্রেয়সী, তুমি আমার শ্রেয়সী।

দুই  
সেই রাতে আর ঘুম হয়নি অরণীর। সাবের খানের বলা, তুমি আমার শ্রেয়সী, কথাটা মাথা থেকে সরছে না তার। বার বার সেই একটি কথাই মাথায় ঘুরছে তার, তুমি আমার শ্রেয়সী। ভাবনার পোকা এসে অরণীর মাথায় বাসা বুনে। নিশ্চই সাবের খান আমার প্রেমে ডুবে ডুবে জল খাচ্ছে! তুমি আমার শ্রেয়সী, কি ভারী লজ্জা গো!

গোপনে গোপনে সাবের খানের সব খবর নেয় অরণী। সাবের খান অরণীদের পাড়াতে নতুন এসেছেন। কি একটা প্রাইভেট কম্পানিতে কর্মরত। পোষ্টিং নিয়ে এখানে এসেছেন।

অরণী ক্রমেই সাবের খানের প্রেমে পাগল হয়ে উঠে। সাবের খানকে মনের কথা বলার সুযোগ খুঁজচ্ছে। না, তার সামনের দাঁড়ালে সে কোন ভাবেই ভালো লাগার কথাটি বলে দিতে পারছে না। বার বার তার মনে হয়, বয়সই এখানে বড় বাধা। কিন্তু ভালোবাসাতো আর বয়সের হিসেব করে আসে না। সে তো সাবের খানের মেয়ের বয়সিই হবে, কিংবা তারও ছোট।

তিন 
একদিন অবশ্য অরণী ভালো একটা সুযোগ পেয়েছে সাবের খানকে মনের কথা বলার। একটা কফি হাউজে সেদিন দুজনের আড্ডা বেশ জমছিল। কিন্তু সেদিনই এক চরম সত্যের মুখোমুখি হয় অরণী।

: শোন শ্রেয়সী, বলতো তোমাকে আমি শ্রেয়সী নামে ডাকি কেন?
: কেন?
: শ্রেয়সী আমার মেয়ের নাম।
: তাই নাকি! শ্রেয়সী কি করে? বয়স কত?
: ইয়ে মানে ...! শ্রেয়সী যখন নবম শ্রেণীতে পড়ে, তখন ওর মা সেলিনা খন্দকারের সাথে আমার ডিভোর্স হয়ে যায়।
: মানে? ডিভোর্স হল কেন?
: বড় লোকের মেয়ে ছিল সেলিনা। ভালোবেসে আমরা বিয়ে করি। হঠাৎ কি যেন হয়ে গেল। সেলিনা আমার সাথে আর একই ঘরে বাস করবে না বলে সিদ্ধান্ত নেয়। একদিন ভোরে শ্রেয়সীকে নিয়ে সে তার বাবার বাসায় চলে যায়। তিন দিনের মাথায় আমার হাতে তার ডিভোর্স লেটার আসে।

: তারপর?
: একদিন শুনি শ্রেয়সীকে নিয়ে সেলিনা সুইডেনে চলে গেছে। নিরবে কেঁদে গেলাম মেয়ের জন্যে। শ্রেয়সীকে এভাবে হারাবো চিন্তাও করিনি। বড় আদরের মেয়ে ছিল আমার।
: আর বিয়ে করেননি আপনি?
: ইচ্ছে নেই। সেলিনা আর শ্রেয়সীর স্মৃতি নিয়ে বাকী জীবন পার করে দিব। তোমার সাথে শ্রেয়সীর চেহারার অনেক মিল আছে। প্রথম দিন তোমাকে দেখে মনে হয়েছে এ যেন আমারই মেয়ে শ্রেয়সী।

: খুব ইচ্ছে হচ্ছে শ্রেয়সীকে দেখতে।
: প্রায়ই স্বপ্নে দেখি মেয়েকে। এক কাজ কর, তুমি আমাকে বাবা ডাকো। যতবার আমায় বাবা ডাকবে, ততবার আমি কল্পনা করব আমার মেয়ে আমাকে ডাকছে। যেন সুইডেন থেকে ভেসে আসবে শ্রেয়সীর কন্ঠের বাবা ডাক। তাছাড়া আমি তো তোমার বাবার বয়সিই। তাই না শ্রেয়সী?

অরণী চুপ করে আছে। তার ঠোঁট কাঁপছে। হাত কাঁপছে। কাঁপা কাঁপা হাতে সে কফির মগে চুমুক দিল। এ কোন পরিস্থিতির স্বীকার সে! তার চিন্তার সাথে সাবের খানের চিন্তার কোন মিল নেই। অরণীর চোখে সাবের খান একজন স্বপ্নপুরুষ আর সাবের খানের চোখে অরণী মেয়ে তুল্য একজন শ্রেয়সী। এমন ঘটনা বিচিত্র এই পৃথিবীতে ঘটবে না তো কোথায় ঘটবে?

সাবের খান কফির মগ রেখে অরণীর দিকে তাকালেন। অরণী কফি হাউজের জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছে, যেখানে ঝলমল করছে মধ্য দুপুরের কাঁচা রোদ।

আমিশাপাড়া, নোয়াখালী।

এই বিভাগে আরো আছে

পঞ্চম বর্ষপূর্তি সংখ্যা 175762315318679612

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

সঙ্গে থাকুন

জনপ্রিয়

সাম্প্রতিক

নেটয়ার্ক

  • বিজ্ঞাপন

     vm

    আঁকা-আঁকি আহ্ববান

    আপনার আঁকা, মজার মজার লেখা, ছবি আঁকার কলা-কৌশল, শিল্পীর জীবনী, প্রবন্ধ, চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা অথবা প্রদর্শনীর সংবাদ টুনস ম্যাগে ছাপাতে চাইলে পাঠিয়ে দিন। আমাদের ইমেইল করুন- bangla@toonsmag.com এই ঠিকানায়।

    সহায়তা করুন

    item